এক্সপ্লেইনার

টেকনোফারেন্স : বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যকার প্রযুক্তির দেয়াল!

ধরুন, আপনি আপনার তিন বছরের ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে বিকেলে খেলতে বসেছেন। সে পরম উৎসাহে আপনাকে তার আঁকা একটি ছবি দেখাচ্ছে। ঠিক তখনই আপনার পকেটে থাকা ফোনটি কেঁপে উঠল। একটি নতুন নোটিফিকেশন। আপনি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। এই অতি সাধারণ, আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মুহূর্তটিই কিন্তু একটি বড় সংকটের সূচনা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে টেকনোফারেন্স বা প্রযুক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ। আমাদের খুব কাছের মানুষটির সাথে কাটানো সময়ের মাঝে যখন ডিজিটাল প্রযুক্তি হুট করে ঢুকে পড়ে, তখনই টেকনোফারেন্স ঘটে।

টেকনোফারেন্স কী এবং কেন এটি ঘটছে?

টেকনোফারেন্স শব্দটি মূলত প্রযুক্তি এবং হস্তক্ষেপ এই দুটি ধারণার সমন্বয়ে তৈরি। গবেষক ব্র্যান্ডন টি ম্যাকড্যানিয়েল এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেছেন। সহজ কথায়, যখন কোনো ডিভাইস আমাদের মুখোমুখি কথোপকথন, পারিবারিক খাবার বা খেলার সময়কে বাধাগ্রস্ত করে, তখন তাকে টেকনোফারেন্স বলে। এর সাথে জড়িয়ে আছে ফাবিং বা ফোন স্নাবিং নামক আরেকটি আধুনিক আচরণ। এর অর্থ হলো, আপনার সামনে থাকা মানুষটিকে উপেক্ষা করে ফোনের স্ক্রিনে মগ্ন থাকা। করোনাকালীনে আমাদের জীবন যেভাবে ভার্চুয়াল মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল, তার ফলে এই প্রবণতা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

অনেকেই মনে করেন, একটুখানি ফোন স্ক্রল করলে শিশুর কী-ই বা ক্ষতি হবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা তাদের মা-বাবার কাছ থেকে সম্পূর্ণ মনোযোগ আশা করে। যখন মা-বাবা শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকেও মানসিকভাবে ফোনে ডুবে থাকেন, তখন শিশুরা এক ধরণের শূন্যতা অনুভব করে। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলছেন অনুপস্থিত উপস্থিতি। অর্থাৎ, আপনি ঘরে আছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও।

শিশুর আচরণে এর মারাত্মক প্রভাব

আমেরিকার ১৭০টি পরিবারের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবার অতিমাত্রায় প্রযুক্তির ব্যবহার তাদের দৈনন্দিন পারিবারিক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায়। এই গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের গড় বয়স ছিল তিন বছর। গবেষকরা দেখেছেন, মা-বাবার এই ডিজিটাল ব্যস্ততা বা টেকনোফারেন্স সরাসরি শিশুর খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত রাগ প্রকাশ বা অন্তর্মুখী আচরণের মতো মানসিক সমস্যার সাথে যুক্ত। মা এবং বাবা উভয়ের ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তিগত আসক্তি শিশুর আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

যখন মা-বাবা ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তখন শিশুরা মনোযোগ আকর্ষণের জন্য নানা রকম জেদ বা অবাধ্যতা দেখাতে শুরু করে। তারা বুঝতে পারে যে স্বাভাবিকভাবে কথা বললে মা-বাবার মনোযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, তাই তারা চিৎকার করে বা জিনিসপত্র ভেঙে মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করে। এই আচরণগুলো দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে শিশুর সামাজিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এমনকি একদম ছোট শিশুরাও মা-বাবার মুখভঙ্গি দেখে ভাষা ও আবেগ শেখে। মা-বাবা যদি সবসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে শিশুরা এই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

আমাদের দেশে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এই সমস্যাটি এখন ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে। কর্মব্যস্ত মা-বাবা ঘরে ফিরেও অফিসের কাজ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যস্ত থাকছেন। অনেক সময় শিশুকে শান্ত রাখতে বা খাওয়াতে গিয়ে তাদের হাতেও আরেকটি ডিভাইস তুলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কথোপকথন প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খাবার টেবিল কিংবা বসার ঘর, সবখানেই এখন সবাই শারীরিকভাবে একসাথে থাকলেও প্রত্যেকে নিজ নিজ ডিজিটাল জগতে বন্দি। এটি আমাদের ঐতিহ্যগত পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলোকে শিথিল করে দিচ্ছে।

গবেষণার তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি দ্বিমুখী চক্রের মতো কাজ করে। শিশুর অবাধ্য আচরণে বিরক্ত হয়ে অনেক সময় মা-বাবা ক্লান্তি দূর করতে বা মানসিক চাপ কমাতে স্মার্টফোনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু এই আচরণ সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শিশুর জেদ এবং একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে মা-বাবার প্রতি শিশুর ক্ষোভ তৈরি হয় এবং পারিবারিক সম্পর্কের গুণগত মান নষ্ট হয়। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এটি আরও মারাত্মক রূপ নেয়, যা তাদের বিষণ্ণতা ও খিটখিটে মেজাজের দিকে ঠেলে দেয়।

অ্যাপ এবং গেমগুলোর ডিজাইন এমনভাবে করা হয় যাতে মানুষ সহজেই এগুলোতে আসক্ত হয়ে পড়ে। একে বলা হয় পারসুয়েসিভ ডিজাইন। এর ফলে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও মানুষ বারবার ফোন চেক করতে বাধ্য হয়। তাই শুধু মা-বাবাকে দোষ না দিয়ে এই প্রযুক্তির পেছনের বিজ্ঞানকেও আমাদের বুঝতে হবে। তবে এর সমাধানও আমাদের নিজেদের হাতেই রয়েছে।

মুক্তির উপায়:

টেকনোফারেন্স থেকে বাঁচতে হলে প্রথমেই আমাদের সচেতন হতে হবে। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময়, যেমন খাবারের সময় বা ঘুমানোর আগে, পরিবারে সম্পূর্ণ ডিভাইস-মুক্ত জোন ঘোষণা করা যেতে পারে। শোবার ঘরে ফোন চার্জে না রেখে বাইরে রাখার অভ্যাস করা ভালো। এতে ঘুমের মান যেমন উন্নত হয়, তেমনই দাম্পত্য ও পারিবারিক সম্পর্কও মধুর হয়।

যদি সন্তানের সামনে জরুরি কোনো প্রয়োজনে ফোন ব্যবহার করতেই হয়, তবে তাকে বুঝিয়ে বলুন। যেমন, আমি এখন দাদীর একটি জরুরি ফোন ধরছি বা আমি আমাদের বাজারের তালিকাটি ফোনে লিখে রাখছি যাতে ভুলে না যাই। এতে শিশু নিজেকে অবহেলিত মনে করবে না এবং প্রযুক্তির সুস্থ ব্যবহার শিখবে। ডিজিটাল যোগাযোগ অবশ্যই প্রয়োজনীয়, তবে তা যেন আমাদের বাস্তব জীবনের রক্ত-মাংসের সম্পর্কগুলোকে ধুলোয় মিশিয়ে না দেয়।

 

লেখাটি শেয়ার করুন: 

শিশুদের নিয়ে লিখুন
ছানাপোনায়
ছানাপোনায় লেখালেখি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা

ছানাপোনায় লেখালেখি সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসাগুলো জানুন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন hello@chanapona.com ঠিকানায়। ধন্যবাদ।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবার ও আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্লাটফর্ম।  বাবা-মায়ের জন্য শিশুর শৈশব, বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ডিজিটাল প্যারেন্টিং বিষয়ক নানান পরামর্শ নিয়েই ছানাপোনা। 

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন