দশ বছর বয়সী এলি-মে হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার ত্বকের যত্নের দীর্ঘ তালিকা বা স্কিনকেয়ার রুটিন বুঝিয়ে বলছে টিকটকে। সামান্য টোনার, সিরাম, আর ময়েশ্চারাইজার মেখে সে দর্শকদের দেখাচ্ছে কীভাবে তার ত্বক উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। এই দৃশ্যটি এখন আর কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ কিশোরীর দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। যে বয়সে শিশুদের মাঠে খেলার কথা, সেই বয়সে তারা এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দামি প্রসাধনী মাখতে ব্যস্ত।
কসমেটিকোরেক্সিয়া: যখন প্রসাধনী আসক্তিতে পরিণত হয়
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকরা ইদানীং একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করছেন, যার নাম কসমেটিকোরেক্সিয়া। এর অর্থ হলো খুব অল্প বয়সেই নিখুঁত ত্বক পাওয়ার জন্য প্রসাধনী ব্যবহারের প্রতি অস্বাভাবিক ও ক্ষতিকর ঝোঁক। ইতালীয় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিওভানি দামিয়ানি লক্ষ্য করেছেন, তার অনেক অল্পবয়সী রোগী দিনে প্রায় ১০টি ভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহার করে। এমনকি মেকআপ ছাড়া তারা পরিবারের সামনেও যেতে চায় না। এই প্রবণতা কেবল শৌখিনতা নয়, বরং একটি মানসিক ও শারীরিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিলিয়ন ডলারের বাজার ও ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি
এটি এখন কেবল একটি শখ নয়, বরং কোটি কোটি টাকার এক বিশাল শিল্প। এলি-মে এখন ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী, যার টিকটকে ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি অনুসারী আছে। তার মা সোফি জানান, এই কন্টেন্ট তৈরি করেই তাদের পরিবার বছরে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ৭০ লাখ টাকার বেশি আয় করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘গেট রেডি উইথ মি’ বা সাজগোজের ভিডিওগুলো শিশুদের মধ্যে প্রসাধনী কেনার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি করছে। বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো এখন সরাসরি শিশুদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন না দিলেও, খুদে ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে তাদের পণ্য ঠিকই পৌঁছে যাচ্ছে পড়ার টেবিল পর্যন্ত।
অল্প বয়সে প্রসাধনী ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে বড়দের জন্য তৈরি করা প্রসাধনী শিশুদের ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। রেটিনল বা অ্যান্টি-এজিং ক্রিম ছোটদের ত্বকের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে দেয়। এর ফলে রেটিনল বার্ন বা ত্বকে জ্বালাপোড়া, একজিমা এবং দীর্ঘমেয়াদী সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর জিন আয়ার বলেন, ছোটদের ত্বক এমনিতেই নিখুঁত থাকে। সেখানে এসব রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং এসবের ব্যবহারে কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস বা এক ধরণের চর্মরোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় যা পরে স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
পাই (Pai) নামক একটি স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেকই প্রতি সপ্তাহে একাধিক প্রসাধনী ব্যবহার করে। এদের মধ্যে বড় একটি অংশ মনে করে তাদের ত্বকে সমস্যা আছে এবং সেটি ঢাকতেই তারা এসব ব্যবহার করছে। এছাড়া টিকটকের ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিশোরীদের ব্যবহৃত একেকটি স্কিনকেয়ার রুটিনের গড় খরচ প্রায় ১২৫ পাউন্ড বা প্রায় ১৯ হাজার টাকার বেশি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: কতটা ঝুঁকিতে আমাদের কিশোরীরা?
বাংলাদেশেও ইদানীং কিশোরীদের মধ্যে স্কিনকেয়ার এবং মেকআপের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ফেসবুক এবং ইউটিউবে দেশি বিউটি ভ্লগারদের ভিডিও দেখে স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা বিভিন্ন ক্ষতিকারক হোয়াইটেনিং ক্রিম বা নামী ব্র্যান্ডের নকল প্রসাধনী ব্যবহার করছে। ঢাকার অনেক নামী পার্লারে এখন শিশুদের জন্য আলাদা ফেসিয়াল বা স্কিন ট্রিটমেন্টের বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সস্তা ও ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহারের ফলে অল্প বয়সেই অনেকের ত্বকে স্থায়ী ক্ষত বা ব্রণের সমস্যা তৈরি হচ্ছে যা তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে।
তথ্য ও গবেষণার ফলাফল
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় কাটায়, তাদের মধ্যে নিজেদের চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতা বেশি থাকে। ইতালীয় মনোবিজ্ঞানী আলবার্তো স্টেফানা বলেন, শিশুরা এখন ডিজিটাল ফিল্টারের মতো নিখুঁত হতে চায়, যা বাস্তবে অসম্ভব। তারা যখন আয়নায় নিজেদের আসল চেহারা দেখে, তখন তারা লজ্জিত বোধ করে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিউটি ইন্ডাস্ট্রির এই ক্রমবর্ধমান বাজার কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে। এটি বডি ডিসমরফিক ডিজঅর্ডার বা নিজের খুঁত নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার মতো মানসিক রোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাদের।
শেষ পর্যন্ত, সুস্থ ত্বক পাওয়ার চেয়েও জরুরি হলো নিজের স্বাভাবিক চেহারাকে গ্রহণ করতে শেখা। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব থেকে দূরে রাখা এবং তাদের বোঝানো যে প্রকৃত সৌন্দর্য কোনো প্রসাধনীতে নয়। শিশুদের ত্বক প্রাকৃতিকভাবেই সুন্দর, সেখানে বাড়তি রাসায়নিকের প্রলেপ কেবল ক্ষতিই ডেকে আনে। সচেতনতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে এই কসমেটিকোরেক্সিয়া থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে।






