আধুনিক জীবনে আমাদের সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখছে স্মার্টফোন। বিশেষ করে যখন আমরা সন্তানদের সাথে সময় কাটাই, তখন মাঝেমধ্যেই ফোনের নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। এই ডিজিটাল বিড়ম্বনা শিশুদের সাথে আমাদের সম্পর্কের গভীরতা কমিয়ে দিতে পারে।
প্রযুক্তির এই অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপকেই বলা হয় টেকনোফারেন্স। এই লেখায় আমরা আলোচনা করব কীভাবে এই ডিজিটাল ব্যস্ততা শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং কীভাবে আমরা এর সমাধান পেতে পারি।
টেকনোফারেন্স আসলে কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, কোনো ব্যক্তির প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে যখন তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটে, তাকেই টেকনোফারেন্স বলে। যেমন রাতের খাবারের সময় মোবাইলে স্ক্রল করা কিংবা কথা বলার মাঝখানে মেসেজ চেক করা।
এটি শুধু বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক নয়, বরং বন্ধু, সহপাঠী কিংবা দম্পতিদের মাঝেও দূরত্ব তৈরি করতে পারে।
টেকনোফারেন্সের কারণে শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে যে গুণগত সময় পাওয়ার কথা ছিল, তা থেকে বঞ্চিত হয়।
শিশুদের ওপর টেকনোফারেন্সের প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান পাশে থাকাকালীন যেসব বাবা-মা ফোন ব্যবহার করেন, তারা বাচ্চাদের প্রতি কম মনোযোগ দেন। এতে তাদের মধ্যে কথা কম হয় এবং আলাপচারিতার মানও কমে যায়। শিশুদের সঠিক বিকাশের জন্য বাবা-মায়ের নিবিড় সান্নিধ্য অত্যন্ত জরুরি।
যখন বাবা-মায়েরা ডিভাইসের প্রতি বেশি মনোযোগী থাকেন, তখন শিশুরা মনোযোগ আকর্ষণের জন্য জেদ বা খারাপ ব্যবহার করতে পারে। এই আচরণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ছোট বাচ্চারা বাবা-মায়ের অনুকরণ করে শেখে। কিন্তু বাবা-মা ফোনে ব্যস্ত থাকলে শিশুরা সেই সুযোগ পায় না, যা তাদের শেখার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব বেশ গভীর। যেসব কিশোর-কিশোরীর বাবা-মা ডিভাইসে বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য তুলনামূলকভাবে খারাপ হতে পারে এবং তাদের আচরণে সহিংসতা বা উগ্রতা প্রকাশ পাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অভিভাবকদের ওপর এর প্রভাব
টেকনোফারেন্স শুধু শিশুদের নয়, অভিভাবকদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক বাবা-মা জানান যে, সন্তানদের সাথে খেলার সময় ফোন ব্যবহার করলে তারা খেলার প্রকৃত আনন্দ পান না। এতে তাদের মানসিক তৃপ্তি কমে যায় এবং একঘেয়েমি তৈরি হয়।
এছাড়া এটি সহ-প্যারেন্টিং বা স্বামী-স্ত্রীর একত্রে সন্তান লালন-পালনের বিষয়টিকেও কঠিন করে তোলে। ফোনের কারণে কাজে বারবার ব্যাঘাত ঘটলে একে অপরকে সাহায্য করা বা সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা পরিবারে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
বাবা-মায়েরা কী করতে পারেন?
বাবা-মায়ের উচিত তারা কখন এবং কীভাবে ফোন ব্যবহার করছেন সেদিকে খেয়াল রাখা। ফোন ছাড়াই সন্তানদের সাথে ভালো সময় কাটানোর বা বিনোদনের উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। এটি পরিবারের সবার মাঝে সুস্থ সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
যদি সন্তানের সামনে খুব জরুরি কোনো কারণে ফোন ব্যবহার করতেই হয়, তবে তাকে সেটা বুঝিয়ে বলুন। যেমন, আমি একটি দরকারি কাজ করছি বা বাজারের তালিকাটা ফোনে দেখে নিচ্ছি যাতে ভুলে না যাই। এতে সন্তান নিজেকে অবহেলিত মনে করবে না।
পারিবারিক নিয়মগুলো সবার জন্যই সমান হওয়া উচিত। খাবারের টেবিলে ফোন ব্যবহার না করার নিয়ম থাকলে বাবা-মাকেও তা মেনে চলতে হবে। কোনো বিশেষ প্রয়োজনে নিয়ম ভাঙতে হলে সেটিও আগে থেকে স্পষ্ট করে বলা ভালো।
উপসংহার
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এটি যেন সম্পর্কের উষ্ণতা কেড়ে না নেয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের শৈশবকে অর্থবহ করে তুলতে আমাদের মনোযোগ ও উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় উপহার।
গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, সচেতনতা ও ধৈর্যই পারে টেকনোফারেন্সের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে। সন্তানদের সাথে ডিজিটাল দূরত্ব কমিয়ে মনের টান বাড়ানোই হোক আমাদের লক্ষ্য।
সূত্র: লার্ন অ্যান্ড এক্সপ্লোর






