ধরুন আপনি ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। আপনার বারো বছরের সন্তান সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছে। হঠাৎ সে অবাক হয়ে আপনাকে একটা ভিডিও দেখাল, যেখানে পরিচিত কোনো মানুষ এমন কিছু বলছে যা তার বলার কথা নয়। আবার হয়তো আপনার চার বছরের বাচ্চাটা ট্যাবে কার্টুন দেখছে। দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা আকর্ষণীয় খেলনার বিজ্ঞাপন চলে এল। বাচ্চাটি ভাবল, এটাও কার্টুনেরই অংশ, আর সে ওই খেলনাটা কেনার বায়না ধরল। আমাদের ঘরে ঘরে প্রতিদিন এমন ঘটনা ঘটছে। এগুলো আমাদের সামনে একটা বড় প্রশ্ন তুলে ধরে, অনলাইনে আমাদের বাচ্চারা যা দেখছে, তার কতটা আসল আর কতটা বানানো, তা কি তারা বুঝতে পারছে?
মিডিয়া লিটারেসি আসলে কী এবং এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
এখানেই আসে মিডিয়া সাক্ষরতা বা মিডিয়া লিটারেসির বিষয়টি। শুনতে একটু খটমটে লাগলেও, এটি আসলে বর্তমান সময়ে টিকে থাকার একটা খুব সাধারণ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা। মিডিয়া লিটারেসি মানে হলো অনলাইনে বা টিভিতে আমরা যা দেখি, পড়ি বা শুনি, তা বুঝতে পারা, যাচাই করা এবং নিজেরাও দায়িত্বশীলভাবে তৈরি করতে পারা। সোজা কথায়, কোনো ভিডিও বা খবর দেখে আপনার সন্তানের মনে এই প্রশ্নগুলো আসা, ভিডিওটা কে বানিয়েছে? কেন বানিয়েছে? তারা কি আমাকে কোনো কিছু বিক্রি করতে চাইছে, নাকি আমাকে রাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে?
বাচ্চারা এখন অনলাইনে কত সময় কাটায়, তার দিকে তাকালে এই দক্ষতার গুরুত্ব বোঝা যায়। কমন সেন্স মিডিয়ার গবেষণায় দেখা যায়, আট থেকে বারো বছর বয়সী বাচ্চারা দিনে গড়ে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটায়। তেরো থেকে আঠারো বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই সময় প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা। এমনকি দুই বছরের কম বয়সী শিশুরাও দিনে গড়ে এক ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা প্রচুর তথ্যের মুখোমুখি হয়, কিন্তু তারা কি এসব তথ্য যাচাই করতে পারে?
গবেষণায় দেখা গেছে, তথ্যের এই বিশাল প্রবাহের মাঝে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য করা শিশুদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। স্ট্যানফোর্ড হিস্ট্রি এডুকেশন গ্রুপের একটি গবেষণা বলছে, ৮০ শতাংশেরও বেশি স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা আসল খবর আর বিজ্ঞাপনের মাঝে পার্থক্যই ধরতে পারে না। যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২ শতাংশ শিশু আসল এবং ভুয়া খবরের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা রাখে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, টিনএজাররা এখন মূলধারার খবরের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছ থেকেই বেশি তথ্য পায়।
পর্দার পেছনে লুকিয়ে থাকা মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ
বাচ্চারা যখন ইন্টারনেটের সব কিছুকেই সত্যি বলে মেনে নেয়, তখন তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস বা এএপি জানায়, অনেক অ্যাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়া এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে বাচ্চারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করতে থাকে। অটোপ্লে বা অনন্তকাল স্ক্রল করার এই ডিজাইনগুলো বাচ্চাদের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য বানানো। চিকিৎসক ও মনস্তত্ত্ববিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যখন প্ল্যাটফর্মগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে আবেগপূর্ণ বা চমকপ্রদ জিনিসপত্র সামনে আনে, তখন তা বাচ্চাদের ঘুম, বাড়ির কাজ বা শারীরিক খেলাধুলার মতো জরুরি কাজগুলোকে দূরে সরিয়ে দেয়।
এএপি-এর শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জেনি রাডেস্কি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার ডিজাইনই এমন যে তা আমাদের ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করে দেয়। জামা পেডিয়াট্রিকস-এর ১৫৩টি গবেষণার একটি বড় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা শিশুদের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং নিজেদের ক্ষতি করার প্রবণতা বেশি থাকে। র্যাডি চিলড্রেনস হসপিটালের ডা. ক্যাথরিন উইলিয়ামসন মনে করেন, স্ক্রিন টাইমকে ডেজার্ট বা মিষ্টি খাবারের মতো ভাবা উচিত। এটি নিজে থেকে খারাপ কিছু নয়, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই বাচ্চাদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর কাজগুলোর জায়গা দখল না করে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: আমাদের ঘরের ভেতরের নীরব সংকট
আমাদের নিজেদের দেশের ছবিটাও যথেষ্ট চিন্তার বিষয়। স্থানীয় পর্যায়ে করা বিভিন্ন গবেষণা বলছে যে বাংলাদেশের শিশুরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ডিজিটাল ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে খেলার মাঠের অভাব এবং নিরাপত্তার কারণে শিশুরা ঘরের ভেতরেই স্ক্রিন নির্ভর হয়ে পড়ছে।
ঢাকার আইসিডিডিআর,বি-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ৮৩ শতাংশই নিরাপদ মাত্রা ছাড়িয়ে দিনে গড়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে সময় কাটায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৮২ শতাংশই খাওয়ার সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, যাকে স্ক্রিন ফিডিং বলা হয়। এর ফলে প্রায় ৪৬ শতাংশ শিশুর কথা বলার স্বাভাবিক বিকাশে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
সময় বনাম গুণগত মান: দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন
আগে আমরা শুধু ভাবতাম, বাচ্চা কতক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা শুধু মিনিট আর ঘণ্টা গুনতাম। কিন্তু এখন বিশেষজ্ঞদের ধারণা বদলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং এএপি এখন শুধু সময় ম্যাপেই সন্তুষ্ট থাকতে নিষেধ করছে। তারা দেখতে বলছেন বাচ্চা স্ক্রিনে আসলে কী করছে। বিশেষজ্ঞরা এখন স্ক্রিন টাইমকে প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয় এবং অ্যাকটিভ বা সক্রিয়, এই দুই ভাগে ভাগ করেন। একা একা অন্ধকার ঘরে বসে চুপচাপ ইউটিউব ভিডিও বা টিকটক দেখা হলো প্যাসিভ ব্যবহার। এটি বাচ্চাদের ঘুম নষ্ট করে এবং মেজাজ খিটখিটে করে।
অন্যদিকে, শিক্ষামূলক কোনো গেম খেলা, পরিবারের কারও সাথে ভিডিও কলে কথা বলা বা নতুন কিছু তৈরি করা হলো অ্যাকটিভ ব্যবহার, যা বাচ্চাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে সাহায্য করে। মিডিয়া লিটারেসি শেখানোর মূল উদ্দেশ্য হলো বাচ্চাদের শুধু দর্শক হিসেবে না রেখে, তাদের নিজেদের চিন্তাশক্তি কাজে লাগাতে সাহায্য করা। ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া খবর বা মিসইনফরমেশন এখন তরুণদের মানসিক চাপের সবচেয়ে বড় কারণ। তাই তাদের সক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই করতে শেখানোই এখনকার সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
প্রতিদিনের অভ্যাসে মিডিয়া লিটারেসি: অভিভাবকদের জন্য গাইডলাইন
প্রতিদিনের হাজারো ব্যস্ততার মাঝে বাচ্চাদের এই দক্ষতা শেখানো কঠিন মনে হতে পারে। তবে এর শুরুটা হতে পারে বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানোর মাধ্যমে। এএপি অভিভাবকদের জন্য ফাইভ সি নামের একটি চমৎকার গাইডলাইন দিয়েছে। প্রথমত, চাইল্ড বা আপনার সন্তানের স্বভাব বুঝতে হবে। দ্বিতীয়ত, কনটেন্ট বা সে কী দেখছে, তার মান কেমন তা খেয়াল রাখা। তৃতীয়ত, কাম বা বাচ্চা কি রাগ কমানোর জন্য স্ক্রিন ব্যবহার করছে কি না, তা দেখা। চতুর্থত, ক্রাউডিং আউট বা স্ক্রিনের কারণে ঘুম ও খেলাধুলা বাদ পড়ছে কি না, তা বোঝা। আর পঞ্চমত, কমিউনিকেশন বা পরিবারের সাথে খোলামেলা কথা বলা।
সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কো-ভিউয়িং বা একসাথে দেখা। বাচ্চা যখন কোনো কার্টুন দেখছে বা গেম খেলছে, তখন তার পাশে বসুন। কোনো বিজ্ঞাপন এলে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, তোমার কী মনে হয়, ওরা আমাদের কী বিক্রি করতে চাইছে? এই মিউজিকটা কেন ব্যবহার করল? খাওয়ার সময় ফোন দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করুন, এতে তাদের কথা বলার বিকাশ স্বাভাবিক হবে। টানা স্ক্রিন দেখার সময় চোখের আরামের জন্য ২০-২০-২০ নিয়ম শেখান। প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকা জরুরি।
সমাধানের পথ: পুলিশ নয়, হয়ে উঠুন ডিজিটাল বন্ধু
আপনার টিনএজ সন্তান যখন কোনো চমকপ্রদ খবর শেয়ার করতে আসে, তখন তাকে শেখার একটা সুযোগ হিসেবে নিন। অনেক সময় বন্ধুরা কী ভাববে বা বন্ধুদের মাঝে জনপ্রিয় হওয়ার জন্যই টিনএজাররা না বুঝে ভুয়া খবর শেয়ার করে। তাদের পজ বা থামার নিয়ম শেখান। খবরটা কোথা থেকে এসেছে, কে লিখেছে এবং প্রমাণ কী, তা যাচাই করতে বলুন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই ব্যবহার করে এখন ভুয়া ভিডিও বা ডিপফেইক বানানো যায়। তাই ইন্টারনেটে চোখে দেখলেই সব বিশ্বাস না করতে শেখান।
অনলাইনে কিছু দেখে যদি খুব বেশি রাগ বা ভয় লাগে, তবে সাথে সাথে রিঅ্যাক্ট না করতে শেখান। আবেগ বুঝতে পারাই মিডিয়া লিটারেসির অনেক বড় একটি অংশ। পাশাপাশি, আপনাদের নিজেদের শেয়ারেন্টিং বা অনলাইনে বাচ্চাদের ছবি দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক হোন, কারণ ইন্টারনেটে কোনো কিছুই পুরোপুরি মুছে যায় না। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, ৮৬ শতাংশ অভিভাবক নিয়ম করলেও মাত্র ২০ শতাংশ তা মেনে চলতে পারেন এবং ৬৫ শতাংশ অভিভাবক নিজেরাও ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটান। বাচ্চারা কিন্তু আমাদের দেখেই শেখে। আমরা যদি খাওয়ার সময় ফোন চাপি বা না পড়েই শুধু হেডলাইন দেখে খবর শেয়ার করি, তবে ওরাও সেটাই করবে।
বাচ্চাদের সাথে অনলাইনে পথ চলাটা অনেক সময় আমাদের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে। তবে এই দক্ষতা শেখানোর জন্য আপনাকে প্রযুক্তির বড় কোনো বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। আপনার সন্তানের আসলে দরকার আপনার সঙ্গ, আপনার প্রশ্ন করার অভ্যাস এবং খোলামেলা কথা বলার মানসিকতা। ডিভাইস কেড়ে নেওয়া বা কড়া নিষেধ করার চেয়ে, তাদের সাথে আলোচনা করাটা সাইবার বুলিং বা যেকোনো বিপদ থেকে বাঁচাতে বেশি কাজে দেয়। এটা এক দিনের কাজ নয়। তারা যত বড় হবে, এই আলোচনাও তত বদলাবে। শুধু ধৈর্য ধরে তাদের পাশে থাকুন, যাতে অনলাইনে কোনো কিছু দেখে ভয় পেলে বা বিভ্রান্ত হলে তারা নির্দ্বিধায় আপনার কাছে এসে গল্প করতে পারে।





