ডিজিটাল প্যারেন্টিং, ইন্টারনেট আসক্তি

স্ক্রিন ডিপেন্ডেন্সি ডিজঅর্ডার: বাবা-মায়ের জন্য করণীয়

শিশুদের স্ক্রিন ডিপেন্ডেন্সি ডিসঅর্ডার বিষয়ক প্যারেন্টিং গাইড ইলাস্ট্রেশন

ঘর থেকে বের হয়ে কোনো রেস্টুরেন্ট বা পাবলিক প্লেসে একটু চোখ বুলিয়ে দেখুন। খুব বেশিক্ষণ খুঁজতে হবে না, সহজেই এমন কোনো শিশুকে দেখতে পাবেন যার চোখ নিজের মুখের সমান বড় একটি স্ক্রিনে আটকে আছে। বর্তমান যুগে শিশুদের শান্ত রাখা বা তাদের একঘেয়েমি দূর করার জন্য বাবা-মায়ের কাছে সবচেয়ে সহজ সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট। কিন্তু এই ‘সহজ সমাধান’ কি আসলে আমাদের অজান্তেই শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমরা বাস করছি। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সমস্যাটা শুরু হয় তখন, যখন এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এখন একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা একে বলছেন ‘স্ক্রিন ডিপেন্ডেন্সি ডিজঅর্ডার’ বা এসডিডি।

স্ক্রিন ডিপেন্ডেন্সি ডিজঅর্ডার আসলে কী?

ভিডিও গেম খেলা বা স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করার সময় শিশুরা এক ধরণের ঘোরের মধ্যে চলে যায়। যখন তারা দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্ক্রিনের সামনে থাকে, তখন তাদের মধ্যে আসক্তির লক্ষণ দেখা দেয়। মনোবিজ্ঞানী ড. অ্যারিক সিগম্যান তার গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, শিশুদের মধ্যে এই নির্ভরশীলতা এখন এতটাই প্রকট যে একে ‘আসক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা ছাড়া উপায় নেই। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মস্তিষ্ক অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং গঠনশীল হওয়ায় এই আসক্তি তাদের নিউরাল ডেভেলপমেন্ট বা স্নায়বিক বিকাশে মারাত্নক বাধা সৃষ্টি করে।

ইন্টারনেট গেমিং ডিজঅর্ডার, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি বা মোবাইল ফোন ডিপেন্ডেন্সি মূলত এই এসডিডি বা স্ক্রিন ডিপেন্ডেন্সি ডিজঅর্ডারেরই বিভিন্ন রূপ। এটি কেবল একটি অভ্যাস নয়, বরং এটি একটি মানসিক অবস্থা যা শিশুর ব্যক্তিত্ব এবং আচরণে বড় ধরণের নেতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

মস্তিষ্কের গঠনে স্ক্রিন টাইমের প্রভাব

গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব, স্ট্রাইটাম এবং ইনসুলা নামক অংশগুলোর টিস্যু ক্ষয় হতে পারে অথবা এই অংশগুলো সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই অংশগুলো কেন জরুরি? মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব আমাদের পরিকল্পনা করা এবং সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অন্যদিকে ইনসুলা আমাদের মধ্যে সহমর্মিতা এবং সহানুভূতির বোধ তৈরি করে। ফলে যখন এই অংশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন শিশু ক্রমশ খিটখিটে হয়ে পড়ে এবং অন্যের প্রতি দয়াবোধ হারিয়ে ফেলে।

আসক্তির আটটি প্রধান লক্ষণ

আপনার সন্তান কি এসডিডিতে আক্রান্ত? এটি বোঝার জন্য কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ রয়েছে। প্রথমত, শিশু সব সময় স্ক্রিন নিয়ে মেতে থাকে বা অন্য কাজ ফেলে রেখে স্ক্রিনের কথা চিন্তা করে। দ্বিতীয়ত, যখন তার কাছ থেকে ফোন বা ট্যাব সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন সে প্রচণ্ড রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ করে যা উইথড্রয়াল সিম্পটম হিসেবে পরিচিত। তৃতীয়ত, স্ক্রিন ব্যবহারের প্রতি তার সহনশীলতা বেড়ে যায়, অর্থাৎ সে আগের চেয়েও বেশি সময় কাটাতে চায়।

অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে বাইরের খেলাধুলা বা শখের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া এবং ফোন ব্যবহারের সময় নিয়ে বাবা-মায়ের কাছে মিথ্যা বলা। অনেক শিশু নিজের বিষণ্ণতা বা খারাপ মনভাব থেকে বাঁচতে স্ক্রিনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

শারীরিক ও মানসিক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি

পারিবারিক জীবন ও শিশু উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ক্লোডেট অ্যাভেলিনো ট্যান্ডোকের মতে, স্ক্রিন ডিপেন্ডেন্সি ডিজঅর্ডারের কারণে শিশুদের মধ্যে ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রা, পিঠে ব্যথা, চোখের সমস্যা এবং মাথাব্যথা দেখা দেয়। শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি দেখা দেয় মানসিক অস্থিরতা। অনেক শিশু পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে সারাদিন ঝিমুনি অনুভব করে, যার ফলে তাদের পড়াশোনায় মন বসে না। এমনকি তীব্র আসক্তির ফলে শিশুরা অনেক সময় ভাঙচুর করে বা আত্মহত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়ে বসে। সিয়াটল ভিত্তিক থেরাপিস্ট ড. জর্জ লিন বলেন, তার কাছে আসা রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ সমস্যার মূলে রয়েছে অতিরিক্ত গেমিং বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কুপ্রভাব।

বাবা-মায়েদের জন্য করণীয়

ডিভাইস বা গ্যাজেট নিজে থেকে খারাপ কিছু নয়, এটি আমাদের শিক্ষার অংশ। তবে সামঞ্জস্য রক্ষা করাটাই আসল কথা। আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্সের পরামর্শ অনুযায়ী, ১৮ মাসের কম বয়সী শিশুদের ভিডিও চ্যাট ছাড়া অন্য কোনো স্ক্রিনের সামনে রাখা উচিত নয়। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম বরাদ্দ করা যেতে পারে এবং সেটিও হতে হবে মানসম্মত কোনো প্রোগ্রাম।

৬ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্ক্রিন যেন কোনোভাবেই তাদের পর্যাপ্ত ঘুম এবং শারীরিক পরিশ্রমের জায়গা দখল না করে। খাবার টেবিল বা শোবার ঘরের মতো জায়গাগুলোকে পুরোপুরি স্ক্রিন-মুক্ত ঘোষণা করতে হবে। সর্বোপরি, সন্তানের সাথে নিয়মিত কথা বলুন এবং ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে তাদের সচেতন করুন। ডিজিটাল এই যুগে শিশুদের ‘ডিজিটাল নেটিভ’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, তবে তা আসক্তির বিনিময়ে নয়।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু শৈশবের স্বাভাবিক বিকাশ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিন যেন শিশুর কল্পনার জগতকে বন্দি না করে ফেলে, সেই দায়িত্ব বড়দেরই নিতে হবে। আজই আপনার সন্তানের হাতের স্ক্রিনটি সরিয়ে দিয়ে তার হাতে একটি বই বা খেলার বল তুলে দিন।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

ডিজিটাল প্যারেন্টিং
নিয়ে লিখুন ছানাপোনায়
ছানাপোনায় লেখালেখি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা

ছানাপোনায় লেখালেখি সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসাগুলো জানুন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন hello@chanapona.com ঠিকানায়। ধন্যবাদ।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবার ও আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্লাটফর্ম।  বাবা-মায়ের জন্য শিশুর শৈশব, বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ডিজিটাল প্যারেন্টিং বিষয়ক নানান পরামর্শ নিয়েই ছানাপোনা। 

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন