ঘরের কোণে কিংবা সোফার নরম কুশনে কিংবা বিছানায় শুয়ে ছোট্ট শিশু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একটি জ্বলজ্বলে স্ক্রিনের দিকে। এই দৃশ্যটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পরিবারের প্রতিদিনের চেনা ছবি। আমাদের অজান্তেই শিশুদের চেনা শৈশব বদলে গেছে এক ভার্চুয়াল বন্দিত্বে। কিন্তু এই ডিজিটাল রূপান্তর আমাদের সন্তানদের মনের ওপর ঠিক কী প্রভাব ফেলছে?
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সামাজিক মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হাইট তাঁর নতুন বই ‘দ্য অ্যানশাস জেনারেশন’-এ এই পরিবর্তনকে একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, আমরা মূলত শিশুদের খেলার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শৈশবকে কেড়ে নিয়েছি। তার বদলে তাদের হাতে তুলে দিয়েছি ফোন-ভিত্তিক এক কৃত্রিম জীবন। ২০১২ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের গ্রাফ লক্ষ্য করলে এক অবিশ্বাস্য পতন চোখে পড়ে। ঠিক এই সময়েই বাজারে আইফোনের রাজত্ব শুরু হয় এবং ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১২ সালের পর থেকে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে চরম বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় অর্ধেক কিশোর-কিশোরী স্বীকার করেছে যে তারা দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই অনলাইনে কাটায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের আত্মসম্মান ও সামাজিক দক্ষতার ওপর।
বাস্তব সংযোগের অভাব ও ভার্চুয়াল অভিনয়
স্মার্টফোনের স্ক্রিন আমাদের শিশুদের জন্য এক ধরনের অভিজ্ঞতা রোধক হিসেবে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ游戏中 যে মিথস্ক্রিয়া চলে, তা কোনোভাবেই মুখোমুখি যোগাযোগের বিকল্প হতে পারে না। একটি হাসির ইমোজি কখনোই সরাসরি হাসির অনুভূতি বা চোখের ভাষার গভীরতা প্রকাশ করতে পারে না। এখানে যোগাযোগগুলো তাৎক্ষণিক নয়, বরং তা এক ধরনের উদ্বেগের জন্ম দেয়। একটি পোস্ট করার পর শিশুরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে কে কী মন্তব্য করল, কয়টি লাইক পড়ল। এই পারফরম্যান্স বা নিজেকে জাহির করার মানসিকতা তাদের প্রতিনিয়ত এক অসুস্থ সামাজিক তুলনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাস্তব জীবনে শিশুরা যখন একে অপরের সাথে খেলে, তখন তাদের মধ্যে নানা রকম ছোটখাটো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দ্বন্দ্বগুলোই শিশুদের সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তারা নিজেরা আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে শেখে। কিন্তু স্ক্রিনের দুনিয়ায় সেই সুযোগ নেই। সেখানে কোনো সমস্যা হলে সহজেই ব্লক করে দেওয়া যায় বা এড়িয়ে যাওয়া যায়। ফলে বাস্তব পৃথিবীর কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলছে।
বাংলাদেশের শহরগুলোতে খেলার মাঠের তীব্র সংকট রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যস্ত অভিভাবকত্ব। অনেক বাবা-মা নিজেদের ব্যস্ততা সামলাতে কিংবা শিশুকে শান্ত রাখতে খুব অল্প বয়সেই তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন। ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরের পরিবারগুলোতে এটি এখন এক সাধারণ চিত্র। চিকিৎসকেরা বলছেন, আমাদের দেশের শিশুদের মধ্যে অতিমাত্রায় স্ক্রিন আসক্তির কারণে কথা বলতে দেরি হওয়া, চোখের সমস্যা এবং খিটখিটে মেজাজ তৈরির প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এ দেশের শিশুরা একাকীত্ব দূর করতে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় নিচ্ছে, যা তাদের বাস্তব সমাজ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের তুলনায় বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের সারাক্ষণ অনলাইনে থাকার হার দ্বিগুণ হয়েছে। একই সাথে বিশ্বজুড়ে কিশোর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা এবং মানসিক অবসাদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, মধ্যম স্কুল বা হাই স্কুলের শুরুর বছরগুলোতে, যখন শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটে সবচেয়ে দ্রুত, ঠিক তখনই স্মার্টফোনের অবাধ প্রবেশ তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠনে বাধা সৃষ্টি করছে।
মুক্তির উপায়: সম্মিলিত প্রতিরোধ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কিন্তু আমাদের হাতেই রয়েছে। প্রথমত, স্কুলগুলোকে সম্পূর্ণ মোবাইল-মুক্ত ঘোষণা করতে হবে। শিশুরা যেন অন্তত স্কুলের সাত-আট ঘণ্টা সময় কোনো ডিজিটাল বিঘ্ন ছাড়া কাটাতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, অন্তত ১৬ বছর বয়সের আগে কোনো শিশুকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। অভিভাবক হিসেবে আমাদের উচিত সন্তানদের একাকী ফোন না দিয়ে সাধারণ ফিচার ফোন দেওয়া, যাতে কেবল জরুরি যোগাযোগটুকু করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের শিশুদের আবার খেলার মাঠে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আসুন, আজই প্রতিবেশীদের সাথে মিলে সিদ্ধান্ত নিই, আমরা আমাদের সন্তানদের স্ক্রিনের খাঁচায় বন্দি হতে দেব না, বরং তাদের হাতে তুলে দেব মুক্ত আকাশের চাবি।






