এক্সপ্লেইনার

প্রযুক্তি জায়ান্টদের বাণিজ্যিক নকশা বনাম কোমলমতি শিশুদের স্ক্রিণটাইম!

একটি অন্ধকার ঘর, সেখানে একটি শিশু বিছানায় শুয়ে একমনে তাকিয়ে আছে তার স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে। তার চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা রঙের খেলনা, কিন্তু সেগুলোর প্রতি তার কোনো মনোযোগ নেই। তার আঙুলগুলো স্ক্রিনের ওপর অবিরত স্ক্রল করে চলেছে, একের পর এক ছোট ভিডিও বা শর্টস ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। এই দৃশ্যটি আজ আর কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবারের নয়, এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ঘরের প্রতিদিনের বাস্তব ছবি। কিন্তু এই রঙিন স্ক্রিনের আড়ালে আমাদের শিশুরা আসলে কতটা নিরাপদ? ব্রিটিশ গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকমের সাম্প্রতিক একটি তদন্ত প্রতিবেদন এই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

সিলিকন ভ্যালির বিশ বছরের সংস্কৃতি ও অফকমের হুঁশিয়ারি

যুক্তরাজ্যের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে টিকটক এবং ইউটিউবের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংস্থাটি সরাসরি জানিয়েছে যে এই দুটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট ফিড শিশুদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। অফকমের প্রধান নির্বাহী ডেম মেলানি ডয়েস একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, সিলিকন ভ্যালিতে গত বিশ বছর ধরে অনলাইন সুরক্ষাকে গুরুত্ব না দেওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই দীর্ঘদিনের অবহেলা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের নিয়ম না মানে, তবে অফকম কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে।

এই তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে মেটা, স্ন্যাপ এবং রবলক্সের মতো অন্যান্য বড় প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের সুরক্ষায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়েছে। যেমন স্ন্যাপচ্যাট অপরিচিত বড়দের সাথে শিশুদের যোগাযোগের পথ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রবলক্স অনূর্ধ্ব-১৬ বছর বয়সীদের জন্য সরাসরি চ্যাট বন্ধ করার সুবিধা নিয়ে আসছে। কিন্তু টিকটক এবং ইউটিউব তাদের অ্যালগরিদমে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের দাবি, তাদের বর্তমান সুরক্ষাব্যবস্থা শিশুদের জন্য যথেষ্ট। তবে অফকমের সংগৃহীত তথ্য এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করছে।

সোশ্যাল মিডিয়া বিশ্লেষক ম্যাট নাভারা এই পরিস্থিতিকে একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আগের বিতর্কটি ছিল যে প্ল্যাটফর্মগুলো কত দ্রুত ক্ষতিকর কনটেন্ট সরিয়ে নিতে পারছে। কিন্তু বর্তমান বিতর্কটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন প্রশ্ন উঠেছে, একটি ক্ষতিকর কনটেন্ট কেন প্রথম স্থানেই একটি শিশুর স্ক্রিনে প্রদর্শিত হলো। অর্থাৎ, সমস্যাটি এখন আর কেবল কনটেন্টের নয়, এটি প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমের মৌলিক নকশার সমস্যা।

অ্যালগরিদমের নেশা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ

টিকটকের শর্ট ভিডিও বা ইউটিউবের শর্টস মূলত এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা ব্যবহারকারীকে স্ক্রিনে আটকে রাখে। এই অ্যালগরিদমগুলো শিশুদের আসক্তির মনস্তত্ত্বকে ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা অর্জন করে। যুক্তরাজ্যের এডুকেশন কমিটির চেয়ারম্যান হেলেন হেইস স্পষ্ট করে বলেছেন, বাণিজ্যিক স্বার্থের চেয়ে শিশুদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার না দেওয়া পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি অনূর্ধ্ব-১৬ বছর বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর বিধিবদ্ধ নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছেন।

টিকটক এবং ইউটিউব অবশ্য তাদের নিজেদের কিছু সুরক্ষামূলক ফিচারের কথা উল্লেখ করেছে। যেমন টিকটকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সরাসরি বার্তা পাঠানো বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ইউটিউবে অভিভাবকরা স্ক্রিন টাইমের সময় নির্ধারণ করে দিতে পারেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ফিচারগুলো সমুদ্রের মাঝে ছোট বাঁধ দেওয়ার মতো। মূল সমস্যা যেখানে অ্যালগরিদমের ক্ষতিকর কনটেন্ট পুশ করার প্রবণতা, সেখানে কেবল সময় নির্ধারণ করে দিয়ে শিশুদের নিরাপদ রাখতে অসম্ভব।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: অরক্ষিত শৈশব ও নীতিমালার অভাব

বিশ্বজুড়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে এত কঠোর আলোচনা চলছে, তখন বাংলাদেশে এই চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। আমাদের দেশে টিকটক, লাইকি বা ইউটিউব শর্টসের ব্যবহার শিশুদের মধ্যে আসঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অনেক অভিভাবকই ঘরের কাজ বা নিজেদের ব্যস্ততা সামলাতে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম বাংলা ভাষার ক্ষতিকর বা অনোপযোগী কনটেন্টগুলো কতটা ফিল্টার করতে পারছে, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।

বাংলাদেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে এখনো কোনো কঠোর বা সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে আমাদের শিশুরা প্রতিনিয়ত এমন সব কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে যা তাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে সাইবার বুলিং বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো ভয়াবহ ঘটনার শিকার হচ্ছে সাধারণ কিশোর-কিশোরীরা। পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে প্রযুক্তি জায়ান্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনছে, সেখানে বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

ডেটা কর্নার: পরিসংখ্যানের আয়নায় বর্তমান সংকট

অফকমের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আট থেকে বারো বছর বয়সী শিশুদের ৮৪ শতাংশই এমন সব অ্যাপ ব্যবহার করছে যার জন্য ন্যূনতম বয়স হতে হবে অন্তত তেরো বছর। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের মলি রোজ ফাউন্ডেশন নামের একটি অনলাইন নিরাপত্তা চ্যারিটির প্রধান অ্যান্ডি বারোজ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই উদাসীনতাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অবিলম্বে পারসোনালাইজড অ্যালগরিদম বা ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী তৈরি করা ফিড নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন, যা প্রতিনিয়ত শিশুদের দিকে ক্ষতিকর কনটেন্টের সুনামি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি অনূর্ধ্ব-১৬ বছর বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার একটি আইন নিয়ে কাজ করছে। তবে অনলাইন নিরাপত্তা গবেষক অধ্যাপক ভিক্টোরিয়া বেইন্স মনে করেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা কঠিন। কারণ শিশুরা সহজেই ভুল বয়স দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করে ফেলে। তাই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর আচরণগত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত বয়স নির্ধারণ করার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।

অভিভাবকদের করণীয়: যেভাবে সুরক্ষিত রাখবেন আপনার সন্তানকে

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে অ্যালগরিদম পরিবর্তন করতে সময় নেবে, কিন্তু আপনার সন্তানের সময় সীমিত। তাই অভিভাবকদের এখনই সচেতন হতে হবে। সন্তানের ডিভাইস ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার পাশাপাশি তারা ইন্টারনেটে ঠিক কী দেখছে সেদিকে নিয়মিত নজর রাখুন। ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়গুলো পরিবারের সবাই মিলে উপভোগ করার চেষ্টা করুন, যাতে শিশুরা একাকীত্ব থেকে স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে সেটির সুস্থ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শেখানোই হতে পারে এই ডিজিটাল যুগে আমাদের সন্তানদের সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

শিশুদের নিয়ে লিখুন
ছানাপোনায়
ছানাপোনায় লেখালেখি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা

ছানাপোনায় লেখালেখি সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসাগুলো জানুন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন hello@chanapona.com ঠিকানায়। ধন্যবাদ।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবার ও আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্লাটফর্ম।  বাবা-মায়ের জন্য শিশুর শৈশব, বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ডিজিটাল প্যারেন্টিং বিষয়ক নানান পরামর্শ নিয়েই ছানাপোনা। 

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন