এক্সপ্লেইনার

অনলাইনের সত্যমিথ্যা, শিশুর মিডিয়া লিটারেসি ও বাবা-মায়ের করণীয়

বিকেলের নাশতা খাওয়ার সময় আট বছরের অবনী হুট করে তার মাকে এসে বলল, “মা, জানো? আমাদের পাশের এলাকায় নাকি একটা ডাইনোসর দেখা গেছে!” মা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কোথায় শুনলে?” অবনী খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিল, “ইউটিউবের একটা ভিডিওতে দেখলাম। ওখানে দেখাচ্ছিল একটা ডাইনোসর রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।”

অবনীর মায়ের কাছে বিষয়টি হাসির মনে হলেও, একটু ভেবে দেখলে এটি কিন্তু বেশ চিন্তার বিষয়। ছোট শিশুরা অনলাইনে যা দেখে, তার অধিকাংশ বিষয়কেই সত্যি বলে ধরে নেয়। তাদের কাছে আসল ভিডিও আর কম্পিউটারে তৈরি করা নকল ভিডিওর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না।

আজকাল আমাদের সন্তানরা ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত কোনো না কোনো স্ক্রিনের সামনে থাকছে। তারা শুধু কার্টুন দেখছে না, চোখের সামনে ভেসে ওঠা নানা রকম তথ্যও দেখছে। কিন্তু এই সব তথ্যের সবটুকু কি সত্যি? কোনটা আসল আর কোনটা সাজানো, তা বোঝার ক্ষমতা কি তাদের তৈরি হয়েছে?

অনলাইনে হাজারো তথ্যের ভিড়ে কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল আর কোনটা সাজানো গল্প, তা বুঝতে পারার এই বিশেষ ক্ষমতাই হলো মিডিয়া লিটারেসি। সহজ কথায়, এটি হলো ইন্টারনেটে বা টিভিতে দেখা কোনো তথ্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, একটু ভেবে দেখার ক্ষমতা।

শুধু মোবাইল চালাতে পারলেই কি সব জানা হয়ে যায়?

অনেকেই ভাবেন, সন্তান যদি খুব দ্রুত ইউটিউবে নিজের পছন্দের ভিডিও খুঁজে বের করতে পারে কিংবা মোবাইলের লক খুলে গেম খেলতে পারে, তবে সে প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠেছে। আসলে বিষয়টি তা নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারা আর প্রযুক্তির ভেতরের ভালো-মন্দ বুঝতে পারার মধ্যে অনেক বড় তফাত রয়েছে।

আমরা যেভাবে বড় হয়েছি, আমাদের সন্তানদের পৃথিবীটা কিন্তু ঠিক সেরকম নয়। আমাদের সময়ে তথ্যের উৎস ছিল সীমিত, খবরের কাগজ, বই আর টেলিভিশনের দু-একটি চ্যানেল। কিন্তু এখন ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউব খুললেই তথ্যের বন্যা বয়ে যায়। এই বন্যায় আমাদের সন্তানরা যাতে বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্যই তাদের এই বিশেষ ক্ষমতাটি শেখানো দরকার।

কেন বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাবা দরকার?

ইন্টারনেটে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে হলে তাদের শুধু ডিভাইস থেকে দূরে রাখলে চলবে না। ইউনিসেফের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের সুরক্ষিত রাখা যায় না। বরং তাদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তারা নিজেরাই ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে। বিশ্বজুড়ে শিক্ষাবিদ ও মনস্তত্ত্ববিদরা এখন এই দক্ষতাটিকে শিশুদের অনলাইনে টিকে থাকার প্রধান যোগ্যতা হিসেবে দেখছেন।

ভাবুন তো, কোনো ভুল তথ্য বা সাজানো খবর যদি আপনার সন্তানের মনের ওপর প্রভাব ফেলে, তবে কী হতে পারে? হয়তো কোনো একটি ভিডিওতে দেখানো হলো কোনো ক্ষতিকর খাবার বা কোনো বিপজ্জনক খেলা। শিশুটি যদি বুঝতে না পারে যে ভিডিওটি শুধু ভিউ বা সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর জন্য বানানো হয়েছে, তবে সে সেটি করতে গিয়ে বড় বিপদে পড়তে পারে। ইন্টারনেটে দেখা সব ছবি বা ভিডিও যে সঠিক নয়, এটি শিশুকে বোঝাতে হবে।

মিথ্যা বা সাজানো তথ্য কীভাবে শিশুর ক্ষতি করে?

অনলাইনে এখন অনেক কিছুই এমনভাবে সাজানো থাকে যা দেখে চট করে বোঝার উপায় নেই যে এটি মিথ্যা। যেমন, বিজ্ঞাপনে কোনো একটি চকোলেট খেলে অলৌকিক শক্তি পাওয়ার দাবি করা হতে পারে। অথবা কোনো একটি ভিডিওতে কাউকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে।

শিশু যখন এই বিষয়গুলো যাচাই না করেই বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন তার নিজের মতো করে চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যায়। সে যেকোনো কিছুতেই সহজে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এটি তার মানসিক বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে। সে বন্ধুদের সঙ্গে মেশার সময় বা নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়তে পারে।

ঘরে বসেই যেভাবে শুরু করতে পারেন

সন্তানকে এই দক্ষতা শেখানোর জন্য আপনাকে কোনো বড় ক্লাসে ভর্তি করাতে হবে না। আপনার ঘরের ছোট ছোট আলোচনা থেকেই এটি শুরু হতে পারে। যেমন, রাতে একসঙ্গে খাওয়ার টেবিলে বা বিকেলে গল্প করার সময় কিছু সহজ কাজ করতে পারেন।

প্রথমত, প্রশ্ন করতে শেখান। আপনার সন্তান যখন কোনো ভিডিও দেখে আপনাকে এসে কিছু বলবে, তখন সরাসরি হ্যাঁ বা না বলবেন না। তাকে জিজ্ঞেস করুন, “তুমি যে ভিডিওটি দেখলে, সেখানে এই তথ্যটি কে বলেছে?” বা “তোমার কী মনে হয়, এটি কি আসলেই সম্ভব?” এই ধরনের প্রশ্ন শিশুকে নিজে নিজে চিন্তা করতে সাহায্য করে। সে বুঝতে শেখে যে যেকোনো কথাই সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞাপনের ভেতরের আসল উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বলুন। ধরুন, টিভির পর্দায় বা ফোনে একটি সুন্দর খেলনার বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে। শিশুকে বুঝিয়ে বলুন, “ওরা কিন্তু এই খেলনাটি বিক্রি করার জন্য এত সুন্দর করে দেখাচ্ছে। বাস্তবে হয়তো এটি এত বড় বা এত চকচকে নাও হতে পারে।” এতে শিশু বুঝতে পারবে যে সব প্রচারণার পেছনেই একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে।

তৃতীয়ত, ইন্টারনেটের কারসাজিগুলো ধরিয়ে দিন। আজকাল ছবি বা ভিডিও এডিট করা খুবই সহজ। শিশুকে কম্পিউটারে বা ফোনে সাধারণ কোনো এডিটিং অ্যাপের মাধ্যমে তার নিজের একটি ছবি একটু বদলে দেখান। যেমন তার মাথায় একটা মজার কার্টুন বসিয়ে দিলেন বা ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড বদলে দিলেন। তাকে বলুন, “দেখো, আমি কীভাবে এই ছবিটা বদলে দিলাম! ইন্টারনেটের অনেক ছবি বা ভিডিও-ও ঠিক এভাবেই বদলে দেওয়া হয়।” এই ছোট্ট কাজটি তার চোখের সামনে একটি বড় সত্য তুলে ধরবে।

যে ভুলগুলো অনেক মা-বাবা অজান্তেই করে ফেলেন

অনেক মা-বাবা সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবে ইন্টারনেট বা মোবাইল পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি পুরোপুরি সমাধান নয়। ডিভাইস কেড়ে নিলে হয়তো সাময়িকভাবে সমস্যা এড়ানো যাবে, কিন্তু সন্তান যখন বাইরে যাবে বা বড় হবে, তখন সে নিজেকে অসহায় আবিষ্কার করবে।

আরেকটি ভুল হলো, তাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া। সন্তান যখন কোনো কিছু নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করে, তখন তাকে থামিয়ে দেবেন না। “তুমি এত কিছু বুঝবে না” কিংবা “এসব নিয়ে কথা বলতে হবে না”, এই ধরনের কথা তাদের কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তারা তখন লুকিয়ে ভুল তথ্য খুঁজতে শুরু করে।

শেষ পর্যন্ত, বিষয়টি শুধু প্রযুক্তির নয়

সন্তানকে অনলাইনে সচেতন করে তোলার অর্থ এই নয় যে তাকে সবসময় চোখে চোখে রাখতে হবে। এর আসল উদ্দেশ্য হলো, সে যখন একা থাকবে, তখনও যেন নিজের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ভালো নম্বর পাওয়া বা প্রযুক্তির ব্যবহার শেখা দুটোই প্রয়োজনীয়। তবে এই সময়ে এসে কোনটা সত্য আর কোনটা সাজানো গল্প, তা বুঝতে শেখাই সন্তানকে ভবিষ্যতে একজন সুস্থ মনের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন নির্দেশিকাতেও শিশুদের এই মানসিক সচেতনতা বাড়াতে পরিবারের সহযোগিতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

শিশুদের নিয়ে লিখুন
ছানাপোনায়
ছানাপোনায় লেখালেখি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা

ছানাপোনায় লেখালেখি সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসাগুলো জানুন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন hello@chanapona.com ঠিকানায়। ধন্যবাদ।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবার ও আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্লাটফর্ম।  বাবা-মায়ের জন্য শিশুর শৈশব, বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ডিজিটাল প্যারেন্টিং বিষয়ক নানান পরামর্শ নিয়েই ছানাপোনা। 

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন