দুপুরের খাবার টেবিলে বসে আট বছরের সন্তানকে যখন মা বলেন, “আর খেও না, এমনিতেই শরীরটা ভারী হয়ে যাচ্ছে,” তখন আপাতদৃষ্টিতে তা একটি সাধারণ সতর্কবার্তা মনে হতে পারে। তবে জনস্বাস্থ্য গবেষকেরা বলছেন, এই ধরনের আপাত নিরীহ মন্তব্য শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণা আমাদের সামনে এক জটিল ভবিষ্যৎ তুলে ধরেছে, যা প্রতিটি অভিভাবককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু এবং কিশোর অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার হতে যাচ্ছে। ১৯৯০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২০৪টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, গত তিন দশকে বিশ্বজুড়ে স্থূলতার হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে জনস্বাস্থ্য এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি হবে।
গবেষণার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং ৩১ শতাংশ শিশু ও কিশোর অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার ঝুঁকিতে পড়বে। গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই যদি সরকারি পর্যায়ে নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং তীব্র মানসিক বিষণ্নতার মতো জটিলতায় ভুগবে।
বডি শেমিং এবং শব্দের নেতিবাচক প্রভাব
গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক ইমানুয়েলা গাকিদু এই পরিস্থিতিকে একটি সামাজিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থূলতাকে কেবল একটি জাতীয় বিপর্যয় বা ট্র্যাজেডি হিসেবে উপস্থাপন করলে তা শিশুদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। অতিরিক্ত ওজনসম্পন্ন শিশুদের শরীর নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য বা কটূক্তি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি করে। এর ফলে তাদের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসের অস্বাভাবিক ব্যাধি বা ইটিং ডিসঅর্ডার তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজনের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহৃত বিএমআই বা বডি মাস ইনডেক্স পদ্ধতিটি অনেক ক্ষেত্রেই ত্রুটিপূর্ণ এবং পুরোনো। তাই কেবল শিশুর শরীরের আকারের ওপর নজর না দিয়ে তার সামগ্রিক সুস্থতার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। শিশুর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শাসন বা সংশোধনের চেয়ে শিশুর সঙ্গে মানসিক সংযোগ স্থাপন করা বেশি কার্যকর বলে চিকিৎসকেরা মনে করেন।
সংশোধনের চেয়ে সংযোগ স্থাপন বেশি জরুরি । শিশুদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ বক্তৃতা বা কড়া শাসন কোনো কাজে আসে না। এর পরিবর্তে ইতিবাচক ভাষার ব্যবহার ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। যেমন, সন্তানকে “তোমার স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া উচিত” বলার চেয়ে বলা যেতে পারে, “আমাদের শরীর খুব চমৎকার একটি উপহার, চলো এমন খাবার খাই যা আমাদের আরও শক্তিশালী করবে।” খাবারের পুষ্টিগুণ নিয়ে কথা বলার সময় তা শিশুর শরীরে কেমন প্রভাব ফেলছে, সেদিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন।
পরিবারে যেকোনো পরিবর্তন একা শিশুর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে যৌথভাবে করা উচিত। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে পানি পানের অভ্যাস করা বা একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়ার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। শিশুরা সাধারণত যা শোনে তার চেয়ে যা দেখে তা বেশি অনুকরণ করে। তাই মা-বাবা নিজেরা যদি স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং নিজেদের শরীর নিয়ে ইতিবাচক কথা বলেন, তবে শিশুরাও তা সহজে গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যাটি আরও বেশি প্রকট আকার ধারণ করছে। দেশের বড় শহরগুলোতে শিশুদের খেলার মাঠের তীব্র সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত শিক্ষাগত চাপ এবং স্মার্টফোনের স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় কাটানোর অভ্যাস। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের শহুরে শিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ফাস্টফুড এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বাঙালি পরিবারগুলোতে প্রায়শই শিশুকে অতিরিক্ত খাওয়ানোর একটি প্রবণতা দেখা যায়। আবার সেই শিশুই যখন বড় হয়ে ওজনের সমস্যায় ভোগে, তখন তাকে সামাজিকভাবে কটাক্ষের শিকার হতে হয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, আমাদের দেশের মা-বাবাদের এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। শিশুকে জোর করে খাওয়ানো বন্ধ করতে হবে এবং তাকে শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ করে দিতে হবে।
তথ্য ও গবেষণার আয়না
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশু বর্তমানে অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই বৃদ্ধির হার উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, শৈশবের স্থূলতা প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি প্রায় চার গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই এই সংকটকে কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুস্থ জীবনযাত্রার সহজ কিছু উপায়
সন্তানের সুস্থতা নিশ্চিত করতে প্রতিদিনের জীবনে কিছু সহজ পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রতিদিনের খেলাধুলাকে আনন্দদায়ক করে তুলতে পরিবারের সবাই মিলে বিকেলে হাঁটতে যাওয়া বা ঘরেই নাচ গান করা যেতে পারে। রান্নার কাজে শিশুকে যুক্ত করলে তাদের নতুন ও স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। কোমল পানীয়ের পরিবর্তে ফলের রস বা দইয়ের মতো স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, সুস্থতা কোনো নিখুঁত প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি ধারাবাহিক অভ্যাস যা ভালোবাসা এবং সহানুভূতির মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।





