বর্তমান সময়ে শিশুরা পড়াশোনা, বিনোদন বা বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেটে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে। ইন্টারনেট যেমন তাদের শেখার ও যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে, তেমনি এর কিছু ঝুঁকিও রয়েছে।
ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকগুলোকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে শিশুকে নিরাপদ রাখা যায়, তা নিয়ে প্রতিটি অভিভাবকেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কিছু সহজ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে আমরা শিশুদের একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ উপহার দিতে পারি।
১. ইন্টারনেট ব্যবহারের স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করুন
শিশুর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন যে সে অনলাইনে কার সাথে এবং কীভাবে যোগাযোগ করছে। ইন্টারনেটে কোনো ছবি, ভিডিও বা মন্তব্য পোস্ট করার আগে তাকে সতর্ক হতে শেখান। তাকে বুঝিয়ে বলুন যে, একবার কোনো কিছু অনলাইনে শেয়ার করা হলে তা চিরতরে থেকে যায়, যাকে “ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট” বলা হয়। তাই অনলাইনে যেকোনো কিছু শেয়ার করার আগে দুবার ভাবা উচিত। অন্যের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রবেশ না করা বা অনুমতি ছাড়া কারও ফোন ব্যবহার না করার মতো বিষয়গুলোও তাদের শেখাতে হবে।
অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং সাইবার বুলিং বা কাউকে নিয়ে অনলাইনে কটূক্তি না করার গুরুত্ব শিশুকে বোঝান। অনলাইনে কাউকে নিয়ে গুজব ছড়ানো বা আপত্তিকর ছবি শেয়ার করা যে অন্যায়, তা তাদের জানা প্রয়োজন। যদি অনলাইনে কোনো কিছু তাদের অস্বস্তি বা ভয়ের কারণ হয়, তবে যেন তারা সাথে সাথে আপনাকে বা কোনো নির্ভরযোগ্য অভিভাবককে জানায়, সেই ভরসা তাদের দিন।
২. প্রযুক্তির সাহায্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন
শিশুর ব্যবহৃত স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবলেটের সফটওয়্যার সবসময় আপডেট রাখুন। ডিভাইসের প্রাইভেসি সেটিংস এমনভাবে সেট করুন যাতে শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য বা লোকেশন অন্য কেউ দেখতে না পারে। যখন ওয়েবক্যাম ব্যবহার করা হচ্ছে না, তখন সেটি ঢেকে রাখা ভালো। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে গুগল বা অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিনে ‘সেফ সার্চ’ বা প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ফিচার চালু করে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
অনলাইনে যেকোনো ফ্রি শিক্ষামূলক অ্যাপ বা গেম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। কোনো সাইটে শিশুর পুরো নাম বা ছবি চাওয়া হলে তা নির্ভরযোগ্য কি না, তা নিশ্চিত হয়ে নিন। শিশুকে শেখান যেন সে কখনোই নিজের ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড বা পরিবারের কোনো সংবেদনশীল তথ্য অনলাইনে কারও সাথে শেয়ার না করে, এমনকি কাছের বন্ধুদের সাথেও নয়।
৩. শিশুর সাথে অনলাইনে সময় কাটান
অনলাইন জগৎ সম্পর্কে জানতে শিশুর সাথে নিজে সময় কাটান। একসাথে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখা বা গেম খেলার মাধ্যমে আপনি তাকে ভার্চুয়াল জগতের ভালো-মন্দ শেখাতে পারেন। এটি শিশুকে অনলাইনে অন্যদের সাথে ভদ্র ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
ইন্টারনেটে প্রচুর ভুল তথ্য বা গুজব থাকে। শিশুকে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র চেনার উপায় শিখিয়ে দিন, যাতে সে সহজেই বিভ্রান্তিকর তথ্য এড়িয়ে চলতে পারে। এছাড়া, ইন্টারনেটে বিভিন্ন চটকদার বিজ্ঞাপন বা অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রচারণাকে কীভাবে চিহ্নিত করতে হয়, তা শিশুকে বুঝিয়ে বলুন। তার বয়সোপযোগী অ্যাপ ও গেম খুঁজে পেতে তাকে সাহায্য করুন।
৪. নিজের আচরণের মাধ্যমে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করুন
শিশুরা সাধারণত বড়দের দেখেই শেখে। তাই নিজের ইন্টারনেট ব্যবহারের অভ্যাসের দিকে নজর দিন। অনলাইনে শিশুর ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার সময় সচেতন থাকুন। শিশুকে অনলাইনে ইতিবাচক ও সুন্দর মন্তব্য করতে উৎসাহিত করুন। যদি তার অনলাইন ক্লাস থাকে, তবে ক্লাসের নিয়মকানুন মেনে চলা এবং ক্যামেরার সামনে নিজের প্রাইভেসি বজায় রাখার গুরুত্ব তাকে বুঝিয়ে বলুন।
অনলাইনে অপরিচিত কারও ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করার আগে সতর্ক হতে হবে। অপরিচিত প্রোফাইলটি আসল কি না, কোনো কমন ফ্রেন্ড আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি। কোনো চাপ বা কৌতুহলের বশে অপরিচিত কাউকে বন্ধু তালিকায় যুক্ত না করাই ভালো। যদি দেখেন শিশু ইন্টারনেট ব্যবহারের পর মন খারাপ করে আছে বা কোনো কিছু লুকাতে চাইছে, তবে তার সাথে সহানুভূতির সাথে কথা বলুন এবং আশ্বস্ত করুন যে যেকোনো সমস্যায় আপনি তার পাশে আছেন।
৫. সুস্থ বিনোদন ও অফলাইন কার্যক্রমের ভারসাম্য বজায় রাখুন
ইন্টারনেট কেবল ঝুঁকির জায়গা নয়, এটি শিশুর সৃজনশীলতা ও মেধা বিকাশের একটি চমৎকার মাধ্যম। শিশুকে অনলাইনে নতুন কিছু শিখতে, ছবি আঁকতে বা নিজের ভালো লাগার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করুন। ইন্টারনেটে অনেক শারীরিক কসরত বা ব্যায়ামের ভিডিও রয়েছে, যা দেখে তারা ঘরে বসেই শরীরচর্চা করতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, স্ক্রিন টাইমের পাশাপাশি শিশুর শারীরিক খেলাধুলা ও পরিবারের সাথে সময় কাটানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনলাইন ও অফলাইন জীবনের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখতে শিশুকে সাহায্য করুন।





