প্রযুক্তির এই যুগে সন্তানদের হাতে কখন স্মার্টফোন তুলে দেওয়া উচিত, তা নিয়ে অনেক অভিভাবকই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করা একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ বছর বয়স হওয়ার আগেই শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দিলে তা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিষণ্ণতা (ডিপ্রেশন), ঘুমের ঘাটতি এবং স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় এই অভ্যাস।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (AAP)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই গবেষণায় প্রায় ১০,৫০০ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের মস্তিষ্ক গঠন ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ‘অ্যাডোলসেন্ট ব্রেন কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট’ (ABCD)-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
ফিলাডেলফিয়া চিলড্রেনস হসপিটাল, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে এবং কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকরা যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, যেসব শিশু ১২ বছর বয়সের আগেই নিজস্ব স্মার্টফোন পেয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গবেষণায় উঠে আসা মূল স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ১২ বছর বয়সের আগেই স্মার্টফোন ব্যবহার শুরু করেছে, অন্যদের তুলনায় তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই শিশুদের ক্ষেত্রে:
- বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের ঝুঁকি প্রায় ১.৩ গুণ বেশি।
- পর্যাপ্ত ঘুমের ঘাটতি বা অনিদ্রার ঝুঁকি প্রায় ১.৬ গুণ বেশি।
- স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকি প্রায় ১.৪ গুণ বেশি।
গবেষক দলের প্রধান এবং ফিলাডেলফিয়া চিলড্রেনস হসপিটালের শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. রন বারজিলে জানান, গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশেরই ১২ বছর বয়সের মধ্যে নিজস্ব স্মার্টফোন ছিল। আর অধিকাংশ শিশুই গড়ে ১১ বছর বয়সে প্রথম স্মার্টফোন হাতে পেয়েছে। গবেষকরা মূলত ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুদের থেকে সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ফলাফল পেয়েছেন।
স্মার্টফোন দেওয়ার কোনো ‘নির্দিষ্ট বয়স’ কি আছে?
সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই বলে মনে করেন ড. রন বারজিলে। তবে তাদের গবেষণা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, অন্তত ১২ বছর বয়সের আগে স্মার্টফোন দিলে তা শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, প্রতিটি পরিবার তাদের নিজস্ব প্রয়োজন ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে স্মার্টফোনের সুবিধা ও অসুবিধাগুলো বিবেচনা করতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তানের হাতে ফোন তুলে দেওয়ার পর অভিভাবককে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে। ফোন ব্যবহারের কারণে শিশুর জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আসছে কি না, তা খেয়াল রাখা জরুরি। যেমন—তারা রাতে পর্যাপ্ত ঘুমাচ্ছে কি না, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা খেলাধুলা করছে কি না এবং স্ক্রিন টাইমের বাইরে অন্য কাজে সময় দিচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
প্রমাণ-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও বর্তমান চিত্র
ড. বারজিলে জানান, অনেক বিশেষজ্ঞই শিশুদের স্মার্টফোন দেওয়া পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও এতদিন এর সপক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছিল না। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেকোনো সিদ্ধান্ত ‘প্রমাণ-ভিত্তিক’ হওয়া জরুরি। তাই এই গবেষণাটি ডিজিটাল যুগে সন্তানদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
গবেষণায় পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৪ সালের একটি জরিপ তুলে ধরা হয়, যেখানে দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ৯৫ শতাংশেরই নিজস্ব স্মার্টফোন রয়েছে। এছাড়া ৮ থেকে ১০ বছর বয়সীদের এক-তৃতীয়াংশ এবং ১১ থেকে ১২ বছর বয়সীদের অর্ধেকেরও বেশি শিশুর কাছে স্মার্টফোন রয়েছে। এমনকি ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের ১২ শতাংশ এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৮ শতাংশের হাতেও স্মার্টফোন পৌঁছে গেছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব
স্মার্টফোনের এই ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সামাজিক মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হাইট তাঁর ২০২৪ সালের বহুল আলোচিত বই ‘দ্য অ্যাংশাস জেনারেশন’-এ বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ (অ্যাংজাইটি) এবং বিষণ্ণতা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার পেছনে স্মার্টফোনের বড় ভূমিকা রয়েছে।
জোনাথন হাইটের মতে, যখন থেকে কিশোর-কিশোরীরা সাধারণ বাটন ফোনের বদলে স্মার্টফোন ব্যবহার শুরু করেছে, ঠিক তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে তাদের মানসিক সমস্যার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে স্মার্টফোন ছাড়া অন্য কোনো বড় কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
অভিভাবকদের করণীয় ও সচেতনতা
সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার আগে এবং পরে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শিশুর স্ক্রিন টাইম সীমিত রাখা, রাতে ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করা এবং ঘরের বাইরে শারীরিক খেলাধুলায় তাদের উৎসাহিত করা উচিত। ডিজিটাল এই যুগে সন্তানের সুস্থতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের দিকেও সমান নজর দেওয়া জরুরি।






