প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হয়েছে সত্যি, তবে এর কিছু পরোক্ষ প্রভাবও সমাজে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে জন্মহারের ওপর। গবেষকদের মতে, ২০০৭ সালে আইফোন বাজারে আসার পর থেকে বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, যা পরোক্ষভাবে জন্মহার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’ (NBER)-এর গবেষকদের করা একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের ঘাটতি এবং ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল স্মার্টফোনই একমাত্র কারণ নয়; এর পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে।
গবেষণার মূল বিষয়গুলো কী?
মিডলবারি কলেজের অর্থনীতিবিদদের করা এই গবেষণায় ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যকার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে প্রায় ৩৩% থেকে ৫২% ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের ব্যাপক প্রসারের ভূমিকা থাকতে পারে। বিশেষ করে ৩০ বছরের কম বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (CDC)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদের সন্তান জন্মদানের হার প্রায় ২৩% হ্রাস পেয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পেছনে স্মার্টফোনের উত্থানকে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্মার্টফোন যেভাবে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়াচ্ছে
গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন আসার পর থেকে মানুষের সরাসরি মেলামেশা বা ‘ইন-পারসন ইন্টারঅ্যাকশন’ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মানুষ এখন মুখোমুখি কথা বলার চেয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বেশি সময় কাটায়। এর ফলে দম্পতিদের মধ্যে পারস্পরিক সময় কাটানো এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কমে আসছে। পাশাপাশি, ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা ও অতিরিক্ত ব্যবহারও সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ
গবেষকেরা মনে করেন, জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে কেবল প্রযুক্তিকে দায়ী করা ঠিক হবে না। এর পেছনে আরও কিছু বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে:
- আর্থিক চাপ: বর্তমান সময়ে সন্তান লালন-পালনের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, জেনারেশন জেড (Gen Z) এবং মিলেনিয়াল প্রজন্মের প্রায় ৬১% মানুষ মনে করেন, আর্থিক টানাটানির কারণে তারা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন বা সীমিত করছেন।
- দেরিতে সন্তান নেওয়ার প্রবণতা: আধুনিক যুগে নারীরা ক্যারিয়ার ও শিক্ষার পেছনে বেশি সময় দিচ্ছেন। ফলে ৩০ থেকে ৩৪ বছর এবং ৩৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের প্রথমবার মা হওয়ার হার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে পারিবারিক জীবনে এর ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক ধরে রাখতে স্ক্রিন টাইমের চেয়ে পারস্পরিক সরাসরি যোগাযোগকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।






