এক্সপ্লেইনার

শিশুদের ওরাল হেলথ ও মানসিক স্বাস্থ্য : বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

প্রতিদিন সকালে শিশুকে সময়মতো ঘুম থেকে তোলা কিংবা তাদের মোবাইল আসক্তি নিয়ে বাবা-মায়েরা বেশ চিন্তিত থাকেন। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে একবেলা দাঁত ব্রাশ না করা বা অবহেলা করা শিশুর মনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দাঁতের সমস্যা কেবল ব্যথাই তৈরি করে না, এটি শিশুর দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। বর্তমানের দ্রুতগতির জীবনে প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব শিশুদের দাঁত ও মনের ওপর দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি করছে।

গবেষণার আয়নায় শিশুদের দাঁতের করুণ চিত্র

সি এস মট চিলড্রেনস হসপিটালের ন্যাশনাল পোল অন চিলড্রেনস হেলথ এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দাঁতের স্বাস্থ্যের অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক। গবেষণায় ১৮০১ জন অভিভাবকের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে যে, প্রতি তিন জন শিশুর মধ্যে অন্তত এক জন দাঁতের কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৩৬ শতাংশ শিশু গত দুই বছরে ক্যাভিটি, দাঁতের ক্ষয় কিংবা দাঁত ডিসকালার হওয়ার মতো সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে।

তথ্য বলছে, যেসব শিশু দিনে মাত্র একবার বা তার কম সময় দাঁত পরিষ্কার করে, তাদের মধ্যে ৪৪ শতাংশই দাঁতের গুরুতর সমস্যায় ভোগে। অন্যদিকে নিয়মিত দুই থেকে তিনবার পরিষ্কার করার অভ্যেস থাকলে এই হার ৩১ শতাংশে নেমে আসে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা দাঁতের যত্নে বেশি সচেতন হলেও সামগ্রিকভাবে শিশুদের একটি বড় অংশই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে না।

দাঁতের সমস্যা যখন মানসিক যন্ত্রণার কারণ

দাঁতের সমস্যার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সংযোগটি সরাসরি এবং বেশ গভীর। আমেরিকান জার্নাল অফ অর্থোডন্টিক্স এর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, স্কুলে বুলিং বা টিটকারির শিকার হওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের দাঁত বা হাসিই হয় প্রধান লক্ষ্যবস্তু। যেসব শিশুর দাঁত আঁকাবাঁকা বা ক্ষয়প্রাপ্ত, তারা সমবয়সীদের কাছে হাসির পাত্র হওয়ার ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। এর ফলে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হয় এবং তারা সামাজিক মেলামেশা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।

ডেন্টিস্ট ডক্টর কামি হোস এর মতে, ক্যাভিটির কারণে অনেক শিশু প্রতিদিন মৃদু ব্যথার মধ্য দিয়ে যায়। এই ব্যথার কারণে তারা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না এবং খিটখিটে মেজাজের হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শিশুদের আচরণগত সমস্যা বা লার্নিং ডিজঅর্ডার হিসেবে যা চিহ্নিত করা হচ্ছে, তার আসল কারণ ছিল দাঁতের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা যা কখনো নিরাময় করা হয়নি।

সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্মাইল অ্যাংজাইটি

বর্তমান যুগে শিশুরা অনেক কম বয়সেই সোশ্যাল মিডিয়ার সংস্পর্শে আসছে। ডক্টর হোস লক্ষ্য করেছেন যে, আট বছর বয়সী শিশুরাও এখন দাঁত সাদা করার উপায় খুঁজছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টার করা নিখুঁত হাসির ছবি দেখে শিশুদের মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম সৌন্দর্যবোধ তৈরি হচ্ছে। তারা যখন নিজেদের হাসিকে সেই ফিল্টার করা ছবির সঙ্গে মেলাতে পারে না, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা একে স্মাইল অ্যাংজাইটি বা হাসি নিয়ে দুশ্চিন্তা বলে অভিহিত করছেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দাঁতের স্বাস্থ্যের সংকট

বাংলাদেশের শহর কিংবা গ্রাম, সবখানেই শিশুদের মধ্যে চিনিযুক্ত পানীয় এবং প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস খাওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন যে শিশুর দুধের দাঁত তো এক সময় পড়েই যাবে, তাই এর যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই ভুল ধারণা শিশুর স্থায়ী দাঁতের গঠন এবং তাদের মানসিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রবণতা কেবল ব্যথা শুরু হলেই দেখা যায়, যা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাবকে ফুটিয়ে তোলে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও করণীয়

শিশুর দাঁতের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ডক্টর হোস ১, ৪ এবং ৭ এর একটি বিশেষ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। এক বছর বয়সের মধ্যে শিশুর প্রথম ডেন্টিস্ট ভিজিট নিশ্চিত করা উচিত। চার বছর বয়সে চোয়ালের গঠন এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের ধরণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সবশেষে সাত বছর বয়সের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থোডন্টিক মূল্যায়ন করা জরুরি। এই সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতের বড় জটিলতা থেকে শিশুকে রক্ষা করতে পারে।

শিশুর দাঁতের যত্নে কেবল একটি ভালো টুথপেস্ট যথেষ্ট নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল রুটিন প্রয়োজন। শিশুদের জন্য নরম টুথব্রাশ, অ্যালকোহলমুক্ত মাউথওয়াশ এবং নিয়মিত ফ্লস করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাবা-মায়েরা যদি নিজেরা নিয়মিত দাঁতের যত্ন নেন, তবে শিশুরা সেই অভ্যাস দ্রুত রপ্ত করে। মনে রাখবেন, একটি সুস্থ হাসি কেবল সুন্দর ছবি দেয় না, এটি শিশুকে মানসিকভাবে শক্তিশালী এবং আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলে। আজই আপনার শিশুর হাসির প্রতি নজর দিন, কারণ এটিই তার ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।

সূত্র: প্যারেন্টস.কম

লেখাটি শেয়ার করুন: 

শিশুদের নিয়ে লিখুন
ছানাপোনায়
ছানাপোনায় লেখালেখি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা

ছানাপোনায় লেখালেখি সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসাগুলো জানুন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন hello@chanapona.com ঠিকানায়। ধন্যবাদ।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবার ও আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্লাটফর্ম।  বাবা-মায়ের জন্য শিশুর শৈশব, বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ডিজিটাল প্যারেন্টিং বিষয়ক নানান পরামর্শ নিয়েই ছানাপোনা। 

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন