অনলাইন নিরাপত্তা

শিশুর নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার: বাবা-মায়ের করণীয়

আজকাল প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিশুদের হাতে কোনো না কোনো ডিভাইস দেখা যায়। ভাত খাওয়ানো, অবসর কাটানো কিংবা পড়াশোনার প্রয়োজনে শিশুরা দিনের একটি বড় অংশ কাটাচ্ছে অনলাইনে। এই ভার্চুয়াল জগতে তাদের আনাগোনা যেমন তাদের নতুন অনেক কিছু শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে, ঠিক তেমনি না বুঝে অনেক ক্ষতিকর কনটেন্ট বা অপরিচিত মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগও তৈরি করছে। অনেক বাবা-মা বুঝতে পারেন না কীভাবে সন্তানকে এই নতুন পরিমণ্ডলে নিরাপদ রাখবেন।

ইন্টারনেটের দুনিয়াটি বিশাল এবং এখানে ভালো-মন্দ সব ধরনের উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। শিশুরা স্বভাবসুলভ কৌতূহল থেকে এমন অনেক লিংকে ক্লিক করে বসে বা এমন সব ভিডিও দেখে ফেলে যা তাদের বয়সের সাথে মানানসই নয়। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা তাদের মনের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে এবং তাদের স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। তাই শুরু থেকেই তাদের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা এবং একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

অনলাইনে সন্তানকে পুরোপুরি দূরে রাখা এখনকার সময়ে প্রায় অসম্ভব এবং এটি কোনো বাস্তবসম্মত সমাধানও নয়। বরং আমাদের জানতে হবে কীভাবে ঘরের পরিবেশ বজায় রেখে শিশুকে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের নিরাপদ নিয়মগুলো শেখানো যায়। কিছু সহজ কৌশল এবং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে আমরা সন্তানদের একটি সুরক্ষিত পরিবেশ দিতে পারি। কিছু সহজ ও বাস্তবসম্মত নিয়ম প্রতিদিনের জীবনে প্রয়োগ করলেই বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

কেন বিষয়টি নিয়ে কথা বলা জরুরি

ইউনিসেফের এক সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের একটি বড় অংশ প্রতিনিয়ত কোনো না কোনোভাবে অনলাইনে হয়রানি বা ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখার ঝুঁকিতে থাকে। শিশুরা যখন একা একা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে কাটায়, তখন তাদের বাইরের খেলাধুলা এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কমে যায়। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা এমন কিছু মানুষের সংস্পর্শে আসে যারা তাদের সরলতার সুযোগ নিতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মেজাজ খিটখিটে করে তোলে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ কমিয়ে দেয়। শিশুরা যখন বুঝতে পারে না যে ইন্টারনেটে কোন তথ্যটি সত্যি আর কোনটি মিথ্যা, তখন তারা বিভ্রান্তিতে পড়ে। তাই ইন্টারনেটের দুনিয়ায় তাদের একা ছেড়ে না দিয়ে শুরু থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা প্রতিটি পরিবারের জন্য প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সন্তানের সাথে কীভাবে কথা বলবেন

১. ইন্টারনেট নিয়ে সহজ আলোচনা শুরু করুন: সন্তানের সাথে প্রতিদিনের সাধারণ কথাবার্তার অংশ হিসেবে ইন্টারনেট নিয়ে আলাপ করুন। যেমন, তারা আজ অনলাইনে নতুন কী দেখল বা কোন গেমটি খেলল, তা খাবার টেবিলে জানতে চাইতে পারেন। এতে শিশু মনে করবে আপনি তার পছন্দের বিষয়ে আগ্রহী এবং সে নিজে থেকেই তার অনলাইন অভিজ্ঞতার কথা আপনার সাথে শেয়ার করবে। কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে তাদের পছন্দের প্রতি সম্মান দেখালে আলোচনা সহজ হয়।

২. ডিভাইস ব্যবহারের স্থান নির্দিষ্ট করুন: কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা মোবাইল ব্যবহারের জন্য ঘরের একটি সাধারণ জায়গা বেছে নিন। যেমন, বসার ঘরের টেবিলে বসে সবাই ডিভাইস ব্যবহার করবে। এতে শিশুর স্ক্রিনে কী চলছে তা আলাদা করে নজরদারি না করেও স্বাভাবিকভাবেই খেয়াল রাখা যায়। শোবার ঘরে বা দরজা বন্ধ করে ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ না দিলে শিশুরা অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক অনলাইন ঝুঁকি থেকে দূরে থাকে।

৩. পারিবারিক স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করুন: পরিবারের সবার জন্য ডিভাইস ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা তৈরি করুন। যেমন, রাতের খাবারের পর বা ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে কেউ ফোন বা ল্যাপটপ হাতে নেবে না। এই নিয়মটি কেবল শিশুর জন্য নয়, বরং বাবা-মা সহ সবাইকে মেনে চলতে হবে। যখন সন্তান দেখবে বড়রাও নিয়মটি মানছেন, তখন সে নিজেও কোনো আপত্তি ছাড়া এটি মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।

৪. সার্চ ইঞ্জিনের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অন করুন: ইউটিউব, গুগল বা অন্যান্য জনপ্রিয় অ্যাপে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল এবং সেফ সার্চ ফিল্টার চালু করে দিন। এর ফলে শিশুরা ভুলবশত কোনো অনুচিত শব্দ লিখে সার্চ করলেও ক্ষতিকর বা প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট তাদের স্ক্রিনে আসবে না। শিশুদের জন্য তৈরি বিশেষ অ্যাপ যেমন ইউটিউব কিডস ব্যবহার করতে দিতে পারেন। এটি প্রযুক্তিগতভাবেই তাদের একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে দেয়।

৫. ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখার গুরুত্ব শেখান: অনলাইনে নিজের নাম, স্কুলের নাম, ঠিকানা বা ফোন নম্বর শেয়ার না করার নিয়মটি শিশুকে বুঝিয়ে বলুন। যেমন, কোনো গেম খেলতে গিয়ে যদি ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি চায়, তবে তা যেন আপনার অনুমতি ছাড়া না দেয়। শিশুদের স্পষ্ট করে জানান যে ইন্টারনেটের সব মানুষ পরিচিত বা নিরাপদ নয়। এই প্রাথমিক সতর্কতাটি তাদের অনেক ধরনের অনলাইন প্রতারণা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

৬. কোনো সমস্যায় পড়লে আপনাকে জানাতে বলুন: অনলাইনে কোনো ছবি বা ভিডিও দেখে যদি শিশু ভয় পায় বা অস্বস্তি বোধ করে, তবে যেন সরাসরি আপনাকে জানায়। তাকে আশ্বস্ত করুন যে এমন পরিস্থিতিতে সে কোনো ভুল করেনি এবং আপনি তার ওপর রাগ করবেন না। অনেক সময় শিশুরা বকা খাওয়ার ভয়ে লুকিয়ে থাকে, যা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আপনার আশ্বাসের ফলে সে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই আপনাকে জানাতে দ্বিধা করবে না।

যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলা ভালো

অনেক অভিভাবক সন্তানকে অনলাইন থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখার চেষ্টা করেন, যা বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে। ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে শিশুরা লুকিয়ে বা বন্ধুদের কাছ থেকে ডিভাইস ব্যবহারের উপায় খোঁজে। এতে তাদের ওপর নজর রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রযুক্তির ব্যবহার একেবারে বন্ধ না করে বরং এর নিয়ন্ত্রিত ও স্বাস্থ্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সন্তান যদি অনলাইনে কোনো ভুল করে ফেলে বা কোনো ক্ষতিকর সাইটে চলে যায়, তবে তার ওপর চিৎকার করা বা ডিভাইস কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত রাগ দেখালে শিশু পরবর্তীতে যেকোনো বড় সমস্যা আপনার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে। শান্ত মাথায় তাকে বুঝিয়ে বলুন কেন ওই বিষয়টি তার জন্য ক্ষতিকর ছিল। শাসন করার চেয়ে তাকে বুঝিয়ে বলা অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

নিজেরা সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থেকে সন্তানকে ডিভাইস দূরে রাখতে বলা আরেকটি বড় ভুল। শিশুরা সাধারণত বড়দের দেখেই শেখে। আপনি যদি নিজের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে না রাখেন, তবে সন্তানকে এ বিষয়ে নিয়ম মানানো কঠিন হবে। তাই পারিবারিক সময়ে নিজের ফোনটি দূরে রাখুন এবং শিশুর সাথে সরাসরি গল্প বা খেলায় সময় কাটান।

যা মনে রাখবেন

• বসার ঘর বা সবার চোখে পড়ে এমন জায়গায় ডিভাইস ব্যবহার করতে দিন।

• ইউটিউব ও গুগলে সেফ সার্চ ফিল্টার চালু রাখুন।

• প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় সন্তানের সাথে অনলাইন বিষয় নিয়ে কথা বলুন।

• ঘুমানোর আগে সব ধরনের ডিভাইস বন্ধ রাখার নিয়ম করুন।

• ইন্টারনেটে অপরিচিত কারও সাথে কথা বলতে বা ব্যক্তিগত তথ্য দিতে নিষেধ করুন।

• কোনো সমস্যা হলে রাগ না করে শান্তভাবে বাচ্চার পাশে দাঁড়ান।

সবশেষে

শিশুর নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি নিয়মিত দায়িত্বের মতো। এটি একদিনের কোনো পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস এবং আলোচনার মাধ্যমে এটি গড়ে ওঠে। ঘরে একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখলে শিশুরা নিজে থেকেই অনলাইনের ভালো এবং মন্দ দিকের পার্থক্য বুঝতে শিখবে। আমাদের কাজ হলো তাদের পাশে থেকে এই যাত্রায় সহজ ও নিরাপদ উপায়ে সহযোগিতা করা।

ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে একে শেখার একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। যখন শিশুরা জানবে যে কোনো সমস্যায় পড়লে তাদের বাবা-মা পাশে আছেন, তখন তারা অনেক বেশি নিরাপদে অনলাইন ব্যবহার করতে পারবে। ছোটবেলা থেকেই এই নিয়মগুলো মেনে চললে তারা নিজেদের সুরক্ষিত রেখে প্রযুক্তির সঠিক সুবিধা নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। সূত্র: নিজস্ব প্রতিবেদক

লেখাটি শেয়ার করুন: 

শিশুদের নিয়ে লিখুন
ছানাপোনায়
ছানাপোনায় লেখালেখি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা

ছানাপোনায় লেখালেখি সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসাগুলো জানুন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন hello@chanapona.com ঠিকানায়। ধন্যবাদ।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবার ও আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্লাটফর্ম।  বাবা-মায়ের জন্য শিশুর শৈশব, বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ডিজিটাল প্যারেন্টিং বিষয়ক নানান পরামর্শ নিয়েই ছানাপোনা। 

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন