এক্সপ্লেইনার

শিশুর বিকাশে আপনার স্ক্রিণটাইমও কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আজকের যুগে বাবা-মায়েদের ব্যস্ততার শেষ নেই। অফিস, ঘরকন্না আর সামাজিক যোগাযোগ, সব মিলিয়ে আমরা এক মুহূর্তও স্থির হয়ে বসে থাকার সময় পাই না। এই হন্তদন্ত জীবনে স্মার্টফোন আমাদের বড় ভরসা। এক ক্লিকেই বাজার করা যাচ্ছে, দূরে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। আমরা যখন ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকি, তখন অজান্তেই আমাদের আর সন্তানের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তির এই অতিনির্ভরতা আর সরাসরি কথাবার্তার অভাব শিশুর কথা বলা ও যোগাযোগের দক্ষতা বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আপনার সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে দামি খেলনা বা আধুনিক অ্যাপের চেয়েও যা বেশি প্রয়োজন, তা হলো আপনি নিজে। তবুও ছোট পর্দার ওই রঙিন হাতছানি এড়িয়ে সামনে বসে থাকা শিশুটির দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কেন ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সন্তানের চোখে চোখ রাখা জরুরি, তা নিয়ে আজকের এই আলাপ।

তিন বছরেই গড়ে ওঠে আগামীর ভিত্তি: কেন আপনার সঙ্গ শিশুর জন্য অপরিহার্য

আপনি কি জানেন, একটি শিশুর মস্তিষ্কের ৮০ শতাংশ বিকাশ ঘটে তার তিন বছর বয়সের মধ্যে? এই সময়টা অনেকটা উর্বর পলিমাটির মতো, যেখানে আপনি যা বুনবেন তাই ফলবে। শিশুর কথা বলা, চিন্তা করার ক্ষমতা, সামাজিক সম্পর্ক তৈরি এবং ভবিষ্যতে পড়াশোনায় ভালো করার ভিত্তি এই সময়েই তৈরি হয়। আর এই বিকাশ কেবল তখনই সম্ভব, যখন বাবা-মা ও সন্তান নিয়মিত একে অপরের সাথে কথা বলে এবং ভাব বিনিময় করে।

আপনার শিশুর বিকাশের জন্য কোনো প্রযুক্তিই আপনার বিকল্প হতে পারে না। অ্যাপের যান্ত্রিক আওয়াজ আর মায়ের গলার আদুরে ডাকের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তাই শিশুর সাথে কাটানো সময়টুকুতে তথাকথিত ‘কোয়ালিটি টাইম’ বা গুণগত মানের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।

খেলার ছলে শিক্ষা: স্ক্রিন সরিয়ে লুকোচুরি আর ছড়া

শিশুর সাথে খেলা মানেই যে দামি রোবট বা গেমিং কনসোল লাগবে, তা নয়। আমাদের চিরচেনা ‘লুকোচুরি’, ‘খোকন খোকন ডাক পাড়ি’র মতো ছড়া বা তালি বাজিয়ে খেলার যে আনন্দ, তার কোনো তুলনা নেই। এই সাধারণ খেলাগুলোর গভীর এক উদ্দেশ্য আছে: এগুলো শিশুকে সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শেখায়। সে বুঝতে শেখে কখন তার হাসার পালা, কখন হাততালি দেওয়ার পালা। এই যে আদান-প্রদান, এটাই হলো কথোপকথনের প্রথম পাঠ। শিশুকে আদর করে চুমু দেওয়া, টা-টা দেওয়া বা হাততালি দিতে শেখানো—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তার সামাজিক দক্ষতা বাড়িয়ে দেয়।

‘যুগল মনোযোগ’: একই জিনিসের দিকে যখন বাবা-মা ও সন্তান তাকায়

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘জয়েন্ট অ্যাটেনশন’ বা যুগল মনোযোগ। ধরুন, পার্কে একটা ঘাসফড়িং দেখে আপনার সন্তান হাত দিয়ে দেখাল, আর আপনিও ফোনের দিকে না তাকিয়ে সেই ফড়িংটির দিকেই তাকালেন। এই যে দুজন মিলে একই জিনিসের ওপর মনোযোগ দিলেন, এটাই শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অন্যতম চাবিকাঠি।

যখন আপনি সন্তানের সাথে একই বই পড়ছেন বা জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছেন, তখন সে বুঝতে পারে যে তার আগ্রহের বিষয়টির প্রতি আপনিও শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু আপনি যদি সেই সময়ে ফোনে মেসেজ চেক করেন, তবে সেই সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শিশু তখন নিজেকে একা মনে করতে শুরু করে।

কথা ছাড়াও তো কত কথা হয়: চোখের ভাষা আর ইশারার গুরুত্ব

যোগাযোগ মানেই কি কেবল শব্দ বা বাক্য? মোটেও না। চোখের ইশারা, মুখের হাসি, গলার স্বর আর শরীরের ভঙ্গি—এগুলো যোগাযোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি কথা বলতে শেখার আগেই একটি শিশু বাবা-মায়ের মুখের অভিব্যক্তি দেখে আবেগ বুঝতে শেখে।

আমরা যখন ফোনে ব্যস্ত থাকি, তখন আমাদের এই অ-শাব্দিক বা অমৌখিক সংকেতগুলো বন্ধ হয়ে যায়। একে বলা হয় ‘সার্ভ অ্যান্ড রিটার্ন’। শিশু যখন একটি ইশারা করে বা আধো আধো বোল চালে (সার্ভ), তখন বাবা-মায়ের উচিত তার উত্তর দেওয়া (রিটার্ন)। আপনার শিশু যখন আপনার দিকে একটি বল ছুড়ে দিল, আপনিও সেটি তার দিকে ফিরিয়ে দিন। তাকে বুঝিয়ে দিন যে আপনি তাকে দেখছেন, তার কথা শুনছেন। আপনার এই ছোট্ট সাড়া তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।

প্রযুক্তি থাকুক সঠিক মাপে: ডিজিটাল আসক্তি সামলানোর সহজ কিছু উপায়

পুরোপুরি ফোন ছেড়ে দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু কিছু সীমানা তো আমরা টেনে দিতেই পারি।

  • ডিজিটাল-মুক্ত সময়: দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় যেমন—খাওয়ার সময় বা ঘুমানোর ঠিক আগে সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখুন। খাবার টেবিলে বসে মেসেজিং করলে খাবারের স্বাদ পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু পরিবারের সাথে মনের সংযোগটা আর হয় না।
  • স্মৃতি থাকুক হৃদয়ে: বেড়াতে গেলে আমরা ছবি তোলা আর ভিডিও করায় এতই ব্যস্ত থাকি যে আসল মুহূর্তটাই উপভোগ করা হয় না। সব মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করার প্রয়োজন নেই; কিছু সময় কেবল নিজেদের জন্য রাখুন।
  • একসাথে প্রযুক্তি ব্যবহার: যদি শিশুকে কিছু দেখাতেই হয়, তবে তাকে একা ফোন না দিয়ে নিজে সাথে বসুন। স্ক্রিনে যা দেখছেন তা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করুন, তার সাথে কথা বলুন।
  • টাইমার সেট করুন: অনেক সময় আমরা মানসিক ক্লান্তি কাটাতে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করতে থাকি, আর সময়ের হিসাব থাকে না। নিজের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন যাতে আপনি আবার দ্রুত সন্তানের কাছে ফিরে আসতে পারেন।

ক্যামেরার ফ্রেম নয়, স্মৃতি থাকুক হৃদয়ে

আপনার ছোট্ট শিশুটি আপনার দিকে তাকিয়েই পৃথিবীটা চিনতে শিখছে। তার কাছে আপনার মনোযোগের চেয়ে দামি আর কিছুই নেই। ফোন হয়তো আপনার জীবনের অনেক কাজ সহজ করে দিচ্ছে, কিন্তু এই যে শিশুর বেড়ে ওঠার দিনগুলো—এগুলো একবার চলে গেলে আর কখনোই ফিরে আসবে না।

ফেসবুকের স্ট্যাটাস আপডেটের চেয়ে আপনার সন্তানের হাসির শব্দ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফোনটা একটু দূরে রাখুন, সন্তানের চোখের দিকে তাকান আর তার শৈশবকে প্রাণভরে উপভোগ করুন। কয়েক বছর পর যখন সে বড় হয়ে যাবে, তখন আপনার গ্যালারির ছবির চেয়ে আপনার সাথে কাটানো সেই মুহূর্তগুলোর স্মৃতিই তাকে বেশি শক্তি দেবে। আপনার সন্তান হয়তো আজ আপনাকে ধন্যবাদ দেবে না, কিন্তু একদিন আপনি নিজেই নিজের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন যে আপনি তার পাশে ছিলেন।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

শিশুদের নিয়ে লিখুন
ছানাপোনায়
ছানাপোনায় লেখালেখি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা

ছানাপোনায় লেখালেখি সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসাগুলো জানুন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন hello@chanapona.com ঠিকানায়। ধন্যবাদ।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবার ও আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্লাটফর্ম।  বাবা-মায়ের জন্য শিশুর শৈশব, বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ডিজিটাল প্যারেন্টিং বিষয়ক নানান পরামর্শ নিয়েই ছানাপোনা। 

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন