আমরা ভাবি, এক পলক মেসেজ দেখে নিয়ে আবার পড়ায় মন দেওয়া খুব সহজ। একে আমরা নাম দিয়েছি ‘মাল্টিটাস্কিং’। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, এই অভ্যাসটি আসলে আমাদের অজান্তেই সন্তানদের মেধা আর মনোযোগের ধার কমিয়ে দিচ্ছে।
একই সাথে পড়াশোনা আর ফোন: ‘মাল্টিটাস্কিং’ কি আসলেই সম্ভব?
আমাদের অনেক সন্তানই দাবি করে, তারা গান শুনতে শুনতে বা বন্ধুদের সাথে চ্যাট করতে করতে দিব্যি পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। মানুষের মস্তিষ্ক আসলে একসাথে দুটি জটিল কাজ করতে পারে না। আমরা যখন ভাবি আমরা ‘মাল্টিটাস্কিং’ করছি, তখন আদতে আমাদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত এক কাজ থেকে অন্য কাজে সুইচ করে মাত্র।
এই দ্রুত পরিবর্তনের ফলে মস্তিষ্কের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ফলে কোনো কাজই নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হয় না। পড়ার ফাঁকে মেসেজ চেক করা মানে হলো মনোযোগের সেই গভীরতা থেকে বিচ্যুত হওয়া, যা কোনো কঠিন বিষয় বোঝার জন্য জরুরি ছিল।
পড়ার টেবিলে রাখা ‘সাইলেন্ট’ ফোনটিও কি মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে?
২০১৭ সালের একটি চমকপ্রদ গবেষণায় দেখা গেছে, ফোনের উপস্থিতিই মানুষের একাগ্রতা কমিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। গবেষণায় শিক্ষার্থীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। একদল ফোন পাশের রুমে রেখে আসে, অন্যদল ফোন সাইলেন্ট করে ব্যাগে রাখে এবং শেষ দল ফোনটি সাইলেন্ট করে টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখে।
ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। যারা ফোন পাশের রুমে রেখে এসেছিল, পরীক্ষায় তাদের ফলাফল ছিল সবচেয়ে ভালো। এমনকি যারা ফোন ব্যাগে রেখেছিল, তাদের চেয়েও! এর অর্থ হলো, ফোনটি যদি সাইলেন্টও থাকে, আমাদের অবচেতন মন সারাক্ষণ সেটির কথা ভাবতে থাকে। ফোনের ওই ‘অদৃশ্য হাতছানি’ সামলাতেই মস্তিষ্কের শক্তির একটি বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায়, যা পড়াশোনায় কাজে লাগতে পারতো।
কেন কিশোর মন ফোনের হাতছানি উপেক্ষা করতে পারে না?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় কিশোর-কিশোরীদের জন্য ফোন দূরে রাখা অনেক বেশি কঠিন। এর পেছনে কাজ করে তাদের অপরিপক্ক মস্তিষ্ক আর সামাজিক চাহিদার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। বয়ঃসন্ধিকালে মানুষের মস্তিষ্কে ‘ইমপালস কন্ট্রোল’ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না।
পাশাপাশি, এই বয়সে বন্ধুদের সাথে সংযুক্ত থাকা বা তাদের স্বীকৃতি পাওয়াটা এক ধরণের জৈবিক তাড়নায় পরিণত হয়। তাদের কাছে ফোন মানে কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং এটি তাদের বন্ধু মহলে টিকে থাকার একমাত্র মাধ্যম। ‘সবাই অনলাইনে আছে, আমি কি পিছিয়ে পড়ছি?’—এই ভয় বা FOMO (Fear Of Missing Out) তাদের পড়ার টেবিল থেকে বারবার ফোনের দিকে টেনে নেয়।
‘রেজাম্পশন ল্যাগ’: বারবার মনোযোগ হারিয়ে ফিরে আসার অদৃশ্য মাশুল
মনে করুন, একটি লোকাল ট্রেন প্রতি স্টেশনে থামছে। গন্তব্যে পৌঁছাতে তার যতটুকু সময় লাগবে, একটি বিরতিহীন এক্সপ্রেস ট্রেনের চেয়ে তা অনেক বেশি। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই।
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘রেজাম্পশন ল্যাগ’। একটি মেসেজ দেখার পর আবার আগের পড়ার ছন্দে ফিরে আসতে মস্তিষ্কের কয়েক মিনিট সময় লাগে। এই যে বারবার খেই হারিয়ে ফেলা, এতে পড়ার মান খুব সাধারণ হয়ে যায়। ফলে যে পড়াটা এক ঘণ্টায় শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ করতে তিন ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। এতে শুধু সময় নষ্ট হচ্ছে না, বরং আপনার সন্তানের গভীর চিন্তার ক্ষমতাও (Deep Thinking) লোপ পাচ্ছে।
এডিএইচডি ও স্মার্টফোন: কেন এই সমন্বয়টি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
অনেকের ধারণা, যাদের এডিএইচডি (ADHD) বা মনোযোগের ঘাটতি আছে, তারা হয়তো মাল্টিটাস্কিংয়ে ভালো। বাস্তবে কিন্তু চিত্রটা সম্পূর্ণ বিপরীত। এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের জন্য স্মার্টফোনের ছোট ছোট নোটিফিকেশন বা ভিডিওর উত্তেজনা খুব বেশি আকর্ষণীয় হয়।
তারা মনে করে তারা একসাথে অনেক কিছু সামলাতে পারছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের মস্তিষ্কের ‘এক্সিকিউটিভ ফাংশন’ বা কাজ গুছিয়ে করার ক্ষমতা এতে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। স্মার্টফোনের তাৎক্ষণিক আনন্দ বা ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য বা পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত করে দেয় অনেক সহজে।
পড়ার পরিবেশে মনোযোগ ফিরিয়ে আনার কিছু কার্যকর কৌশল
এই ডিজিটাল যুগে ফোন পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়তো সমাধান নয়, কিন্তু কিছু নিয়ম তৈরি করা জরুরি।
১. ফোন থাকুক অন্য ঘরে: পড়ার সময় ফোনটি সাইলেন্ট করে অন্য কোনো ঘরে বা আলমারিতে রেখে দেওয়ার অভ্যাস করুন। চোখের আড়াল মানেই মনের আড়াল। ২. নির্ধারিত ‘ফোন ব্রেক’: সন্তানকে বলুন, টানা ৪৫ মিনিট মনোযোগ দিয়ে পড়লে সে ১৫ মিনিটের জন্য ফোন চেক করতে পারবে। এতে তার মধ্যে একটি লক্ষ্য কাজ করবে। ৩. পড়ার জায়গা হোক ‘টেক-ফ্রি’: পড়ার টেবিল যেন কেবল পড়াশোনার জন্যই হয়। সেখানে ল্যাপটপ বা ফোন যেন অপ্রয়োজনে না থাকে।
পড়াশোনার সময় স্মার্টফোন আসলে এক অদৃশ্য দেয়াল। অভিভাবক হিসেবে আমাদের কাজ হলো সেই দেয়ালটি সরিয়ে দেওয়া। এটি কেবল ভালো রেজাল্টের জন্য নয়, বরং আপনার সন্তানকে জীবনের দীর্ঘ দৌড়ে মনোযোগী ও ধৈর্যশীল করে তোলার জন্য অপরিহার্য। মনোযোগ দিতে শেখাটাও এই সময়ের সবচেয়ে বড় দক্ষতা।





