প্যারেন্টস ওয়েলবিং

বাবা-মায়ের জন্য ইউনিসেফের অনলাইন প্রাইভেসি চেকলিস্ট

ইন্টারনেটে আমাদের প্রতিটি ক্লিক, শেয়ার, কমেন্ট বা পোস্ট একটি স্থায়ী ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করে, যা মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব। আজকের শিশুরা প্রযুক্তির হাত ধরে বড় হচ্ছে। ফলে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং সুনামের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা সচেতনভাবে এবং নিরাপদে এই অনলাইন দুনিয়ায় চলাফেরা করতে পারে। তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতা দেওয়ার পাশাপাশি এর নিরাপদ ব্যবহার শেখানো জরুরি।

আপনার সন্তানের অনলাইন নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে একটি সহজ কিন্তু কার্যকর গাইডলাইন নিচে দেওয়া হলো।

ডিভাইস ও সেটিংসের সুরক্ষা

ডিভাইস আপডেট রাখা: আপনার সন্তান যে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার বা ইন্টারনেট-সংযুক্ত খেলনা, স্পিকার ও স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করছে, সেগুলোর সফটওয়্যার সবসময় আপডেট রাখুন। এটি হ্যাকিং, তথ্য চুরি বা নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে ডিভাইসগুলোকে সুরক্ষিত রাখে। ব্যবহার না করার সময় ওয়েবক্যাম বা ক্যামেরা ঢেকে রাখুন।

প্রাইভেসি সেটিংস যাচাই করা: সোশ্যাল মিডিয়া, গেম এবং বিভিন্ন অ্যাপের সেটিংস অপশনে গিয়ে প্রাইভেসি ও সিকিউরিটি সেটিংস পরীক্ষা করুন। কারা আপনার সন্তানের তথ্য দেখতে পাবে বা তার সাথে যোগাযোগ করতে পারবে, তা এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করুন। এছাড়া অ্যাপগুলো যাতে প্রয়োজন ছাড়া ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, লোকেশন বা গ্যালারির অ্যাক্সেস না পায়, তা নিশ্চিত করুন।

প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করা: ডিভাইস, ইন্টারনেট ব্রাউজার এবং বিভিন্ন অ্যাপে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ফিচার ব্যবহার করে স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ, ক্ষতিকর কনটেন্ট ব্লক এবং অনলাইন কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অনলাইনে সার্চ করে বা নিরাপত্তা বিষয়ক ওয়েবসাইটগুলো থেকে এই ফিচারগুলো ব্যবহারের নিয়ম জেনে নিতে পারেন।

পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা জোরদার করা: পরিবারের সবার অ্যাকাউন্টের জন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু করুন। একটি ভালো পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করতে পারেন এবং সন্তানকে শেখান যে পাসওয়ার্ড কখনোই কারও সাথে শেয়ার করা যাবে না। এছাড়া ডিভাইসে ভালো মানের অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করুন।

নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: অনলাইনের প্রাইভেসি সেটিংস ও ফিচারগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। তাই প্রতি কয়েক মাস পর পর এগুলো পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী আপডেট করে নিন।

ছোট শিশুদের যেভাবে সচেতন করবেন

শুরু থেকেই ধারণা দেওয়া: সন্তান যখন প্রথম ডিভাইস ব্যবহার করা শুরু করবে, তখন থেকেই তাকে অনলাইনের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার গুরুত্ব সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন। আমরা ইন্টারনেটে যা করি, তার একটি স্থায়ী রেকর্ড বা ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ থেকে যায়—এই বিষয়টি তাদের উপযোগী করে বুঝিয়ে বলুন।

নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম বেছে নেওয়া: শিশুদের জন্য তৈরি এবং তাদের উপযোগী অ্যাপ বা গেমগুলো বেছে নিন, যেখানে প্রাইভেসি ও নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়। কোনো অ্যাপ ডাউনলোড করার আগে অন্যান্য অভিভাবকদের রিভিউ দেখে নিতে পারেন।

পারিবারিক নিয়ম তৈরি করা: সন্তানকে স্পষ্ট বুঝিয়ে বলুন যে নিজের পুরো নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, ফোন নম্বর বা স্কুলের নাম কখনোই অনলাইনে শেয়ার করা যাবে না। বন্ধু যতই ঘনিষ্ঠ হোক, পাসওয়ার্ড শেয়ার করা যাবে না। নিজে সচেতনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে সন্তানের সামনে ভালো উদাহরণ তৈরি করুন।

একসাথে ইন্টারনেট ব্যবহার করা: নতুন কোনো অ্যাপ বা গেম ব্যবহারের সময় সন্তানের সাথে থাকুন। শুরুতেই সেই অ্যাপের প্রাইভেসি সেটিংস এমনভাবে সেট করুন যাতে কম তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সন্তানকে সাথে নিয়ে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করা শিখুন। পাসওয়ার্ডে অন্তত ৮টি অক্ষর, সংখ্যা, বড় ও ছোট হাতের অক্ষর এবং বিশেষ চিহ্ন (যেমন- @, #, $) থাকা উচিত, যা অন্য কেউ সহজে অনুমান করতে পারবে না।

সচেতনতা বৃদ্ধি ও যাচাই করা: বাস্তব জীবনের মতো অনলাইনের সবাই যে বিশ্বস্ত নয়, তা শিশুকে বোঝান। অপরিচিত কোনো লিংক বা ইমেইল অ্যাটাচমেন্টে ক্লিক না করতে শেখান। কোনো ওয়েবসাইট নিরাপদ কি না তা বোঝার জন্য ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারে ‘https’ এবং প্যাডলক (তালা) চিহ্ন আছে কি না, তা দেখতে শেখান। কোনো কিছু পোস্ট বা শেয়ার করার আগে তাদের একটু ভেবে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

কিশোর-কিশোরী ও বড় সন্তানদের জন্য করণীয়

খোলামেলা আলোচনা করা: বড় সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখুন। তাদের প্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া বা গেম সম্পর্কে জানতে চান। তাদের জিজ্ঞেস করুন, অনলাইনে কখনো কোনো তথ্য শেয়ার করার জন্য তারা চাপ অনুভব করেছে কি না। কোনো সমস্যা হলে তারা যাতে নির্দ্বিধায় আপনার বা কোনো বিশ্বস্ত অভিভাবকের সাহায্য নিতে পারে, সেই ভরসা দিন।

ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট নিয়ে কথা বলা: কিশোর বয়সীরা অনেক সময় আবেগের বশে অনেক কিছু শেয়ার করে ফেলে। তাদের বোঝান যে অনলাইনে পোস্ট করা যেকোনো ছবি বা তথ্য চিরকাল থেকে যেতে পারে। এগুলো ভবিষ্যতে তাদের উচ্চশিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ছবি বা তথ্য শেয়ার করার আগে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে তাদের সাথে কথা বলুন।

তথ্যের অধিকার সম্পর্কে জানানো: বড় সন্তানদের তাদের ডিজিটাল অধিকার সম্পর্কে সচেতন করুন। সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো তাদের সম্পর্কে কী কী তথ্য সংগ্রহ করছে, তা জানার জন্য একসাথে ‘ডেটা অ্যাক্সেস রিপোর্ট’ ডাউনলোড করে দেখতে পারেন। এতে তারা বুঝতে পারবে যে তাদের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে কীভাবে তাদের পছন্দ-অপছন্দ ও আচরণের প্রোফাইল তৈরি করা হয়।

সন্তানের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা: সন্তানের অনলাইন প্রাইভেসির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিন। তাদের ওপর জোর না করে আপনার উদ্বেগের কারণগুলো বুঝিয়ে বলুন এবং তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই বজায় রাখার দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করুন।

 

সূত্র : ইউনিসেফ

 

লেখাটি শেয়ার করুন: 

শিশুদের নিয়ে লিখুন
ছানাপোনায়
ছানাপোনায় লেখালেখি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা

ছানাপোনায় লেখালেখি সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসাগুলো জানুন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন hello@chanapona.com ঠিকানায়। ধন্যবাদ।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিশুদের বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবার ও আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ছানাপোনা ফিনল্যান্ডভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্লাটফর্ম।  বাবা-মায়ের জন্য শিশুর শৈশব, বেড়ে ওঠা, মানসিক স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও ডিজিটাল প্যারেন্টিং বিষয়ক নানান পরামর্শ নিয়েই ছানাপোনা। 

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন