সারাটা দিন অফিসের কাজ বা ঘরের হাজারটা ঝক্কি সামলে যখন একটু জিরোবেন ভাবছেন, ঠিক তখনই দেখলেন আপনার সন্তানটি একমনে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। আপনি হয়তো বেশ কয়েকবার তাকে ডাকলেন, কিন্তু তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। শেষমেশ যখন একটু কড়া সুরে বললেন বা ফোনটা হাত থেকে সরিয়ে নিলেন, অমনি শুরু হলো কান্নাকাটি আর চিৎকার। আমাদের বাংলাদেশের অনেক ছোট ফ্ল্যাট বাড়িতে বা যৌথ পরিবারে এই দৃশ্যটি এখন প্রতিদিনের গল্প। আপনি হয়তো ক্লান্ত হয়ে ভাবছেন, “কোথায় ভুল হয়ে যাচ্ছে? কেন সে কথা শুনছে না?”
আসলে আপনি একা নন, আপনার মতো হাজারো বাবা-মা এই একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আজকের এই ব্যস্ত জীবনে যখন বাইরে খেলার জায়গা কম, চারপাশে আকাশচুম্বী দালান, তখন মোবাইল বা টিভি অনেক সময় বাচ্চাদের একমাত্র বিনোদন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই ‘স্ক্রিন টাইম’ বা ডিজিটাল পর্দার সামনে সময় কাটানো নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটা খুব স্বাভাবিক। এই লেখাটিতে আমরা সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করব কীভাবে এই অভ্যাস সামলানো যায়, যাতে আপনার ওপর চাপ কমে এবং সন্তানেরও ক্ষতি না হয়।
কেন ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে?
আমাদের ছোটবেলার সাথে এখনকার বাচ্চাদের বড় হওয়া মেলালে চলবে না। আগে বিকেলে পাড়ার মাঠে সবাই মিলে দৌড়ঝাঁপ করা যেত, কিন্তু এখনকার ঢাকা বা বড় শহরগুলোর চিত্রটা ভিন্ন। ছোট ছোট ফ্ল্যাটে বন্দি জীবনে শিশুরা যখন একঘেয়েমিতে ভোগে, তখন ফোন বা ট্যাব তাদের কাছে একটা মজার জগত খুলে দেয়। অনেক সময় কাজের চাপে বা জরুরি প্রয়োজনে আমরাও হয়তো তাদের হাতে ফোন দিয়ে দিই একটু শান্ত রাখার জন্য। এটি কোনো অপরাধ নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনে অনেক সময় আমরা নিরুপায় হয়ে পড়ি।
তবে সমস্যাটা শুরু হয় যখন এটি অভ্যাসে পরিণত হয়। শিশু যখন ফোনের রঙিন জগত আর দ্রুত গতির ভিডিওতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সাধারণ পড়াশোনা বা শান্তভাবে বসে থাকাটা তার কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে। তাই এই বিষয়ে কোনো ভয় না পেয়ে বরং ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার কথা ভাবতে হবে।
শাসন নয়, বরং সহমর্মিতার সাথে কথা বলুন
আপনার সন্তান যখন অনেকক্ষণ ফোন দেখার পর আপনি সেটা কেড়ে নেন, তখন তার ভেতরে একটা জেদ তৈরি হয়। এর বদলে আপনি যদি তার সাথে একটু কৌশলী হন, তবে ফল ভালো পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাকে হুট করে ‘না’ না বলে একটি সময় ঠিক করে দিন।
- আগে থেকেই জানিয়ে রাখা: ধরুন সে কার্টুন দেখছে। আপনি তাকে গিয়ে বলতে পারেন, “আর ৫ মিনিট পর কিন্তু আমরা ফোন রেখে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসব।” এতে সে মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সময় পায়।
- একসাথে সময় কাটানো: মাঝেমধ্যে সে কী দেখছে তা নিয়ে তার সাথে কথা বলুন। “আরে, এই পাখিটা তো খুব সুন্দর ডাকছে!”—এভাবে আপনি তার জগতের অংশ হয়ে গেলে সে আপনার কথা সহজে মানবে।
- বিকল্প কিছু খুঁজে দেওয়া: ফোন রেখে সে কী করবে, সেটা তাকে বলে দিন। হতে পারে তার সাথে একটু লুডু খেলা বা বারান্দায় রাখা গাছে পানি দেওয়া।
পরিবারের সবার সহযোগিতা নেওয়া
আমাদের দেশের পরিবারগুলোতে অনেক সময় দেখা যায় মা হয়তো ফোন বারণ করছেন, কিন্তু দাদু বা নানু আদর করে নাতনিকে ফোন বা রিমোট দিয়ে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ঝগড়া না করে বরং পরিবারের বড়দের বুঝিয়ে বলুন। তাঁদের জানান যে, বাচ্চার চোখের বা মনোযোগের সমস্যার কারণে আপনি চিন্তিত। পরিবারের সবাই মিলে যদি একই নিয়ম মানেন, তবে শিশুর পক্ষে সেটা মেনে নেওয়া সহজ হয়।
দশ বছরের সামি রাতের খাবারের সময়ও ইউটিউব দেখতে চাইত। তার মা তাকে বকা না দিয়ে একটা নিয়ম করলেন যে, খাবারের টেবিলে কেউ ফোন ব্যবহার করবে না—এমনকি তার বাবাও না। প্রথম কয়েকদিন সামি বিরক্ত হলেও যখন দেখল তার বাবা-মা গল্প করছে, সেও ধীরে ধীরে নিজের স্কুলের গল্প বলা শুরু করল।
পড়াশোনা আর স্ক্রিন টাইমের ভারসাম্য
স্কুলের হোমওয়ার্ক আর কোচিংয়ের চাপে এখনকার বাচ্চারা এমনিতেই খুব ক্লান্ত থাকে। এই চাপের মধ্যে ফোন তাদের কাছে একটা পালানোর পথ। তাই স্ক্রিন টাইম একেবারে বন্ধ না করে সেটিকে ‘পুরস্কার’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন—”আজকের পড়াটা শেষ করলে আমরা আধা ঘণ্টা টিভি দেখব।” এতে তার পড়ার প্রতি মনোযোগ বাড়বে এবং সে জানবে যে ফোন দেখার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে।
ছোট কিন্তু কার্যকর কিছু পরিবর্তন
- ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ফোন বন্ধ: রাতে ঘুমানোর আগে ফোন দেখলে বাচ্চাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এই সময়টাতে গল্প বলা বা হালকা কথা বলা যেতে পারে।
- খাওয়ার সময় পর্দা বন্ধ: খাবার খাওয়ার সময় যেন তারা খাবারের স্বাদের দিকে খেয়াল দেয়, ফোনের দিকে নয়।
- বাবা-মা হিসেবে উদাহরণ তৈরি: আমরা নিজেরা যদি সারাক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকি, তবে বাচ্চাদের বারণ করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। চেষ্টা করুন তাদের সামনে যতটা সম্ভব ফোন দূরে রাখতে।
শিশুর মানসিক বিকাশ ও ডিজিটাল জীবন
ডিজিটাল জগত মানেই খারাপ কিছু নয়। অনেক শিশু ফোন ব্যবহার করে নতুন ভাষা শিখছে বা সৃজনশীল কাজ দেখছে। মূল বিষয় হলো নিয়ন্ত্রন। আমরা যখন ছোট ছিলাম, আমরা হয়তো পাশের বাসার বন্ধুদের সাথে খেলতাম। এখন হয়তো সেই সুযোগ কম, তাই বাচ্চাদের এই ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে অতিরিক্ত অপরাধবোধে ভুগবেন না। আপনি আপনার সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন, এটাই বড় কথা।
মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে তাদের নিয়ে আত্মীয়র বাসায় যাওয়া বা পার্কে নিয়ে যাওয়া খুব জরুরি। এতে তারা বুঝতে পারে যে পর্দার বাইরেও একটা বিশাল এবং আনন্দময় জগত আছে। বাচ্চাদের এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো একদিনে আসবে না, এর জন্য ধৈর্য প্রয়োজন।
শেষ কথা
সন্তান লালন-পালন করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি, আর এই যুগে সেটি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে রাখবেন, কোনো বাবা-মা-ই নিখুঁত নন। কোনোদিন হয়তো আপনি খুব ক্লান্ত হয়ে বাচ্চার হাতে ফোন দিয়ে দেবেন, তাতে নিজেকে খুব বেশি দোষ দেবেন না। গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আগামীকাল থেকেই হয়তো সব বদলে যাবে না, তবে ছোট ছোট নিয়ম দিয়ে শুরু করাটাই আসল। আজ অন্তত খাওয়ার টেবিলে বা ঘুমানোর আগে ফোনটা সরিয়ে রেখে সন্তানের সাথে একটু গল্প করে দেখুন। আপনার এই ছোট প্রচেষ্টাটুকুই তার বড় হওয়ার দিনগুলোকে সুন্দর করে তুলবে। আমরা সবসময় আপনার পাশে আছি এই যাত্রায়।






