শিশুকে ভুল তথ্য ও গুজব চেনার উপায় শেখাবেন যেভাবে

নিয়মিত আপনার মেইলে লেখা পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

নিবন্ধটিতে যা যা থাকছে

বর্তমান যুগে আমাদের সন্তানরা খুব ছোটবেলা থেকেই ইন্টারনেট, ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে পরিচিত হয়ে উঠছে। তারা প্রতিদিন নানা ধরনের ভিডিও দেখে বা বন্ধুদের কাছ থেকে বিভিন্ন খবর শোনে, যার সবটা সবসময় সঠিক হয় না। অনেক সময় চমকপ্রদ হেডলাইন বা ভয়ের কোনো খবর দেখে তারা সেটাকে ধ্রুব সত্য বলে মনে করে, যা তাদের মনে অযথা আতঙ্ক বা ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে।

ভুল তথ্য চিনে সঠিকটা খুঁজে বের করার দক্ষতা বা ‘মিডিয়া লিটারেসি’ এখনকার সময়ে শিশুদের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি লাইফ স্কিল। এটি কেবল তাদের বুদ্ধিমান করে তোলে না, বরং ভবিষ্যতে বড় কোনো প্রতারণা বা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকেও রক্ষা করে। অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো সন্তানকে ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখা নয়, বরং তাদের তথ্যের সত্যতা যাচাই করার কৌশলগুলো সহজভাবে শিখিয়ে দেওয়া।

প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করুন

শিশুরা স্বভাবতই কৌতুহলী হয়, কিন্তু ইন্টারনেটে কিছু দেখলে তারা সেটা প্রশ্ন ছাড়াই বিশ্বাস করে ফেলতে পারে। তাদের শেখান যে, কোনো কিছু দেখলেই বা শুনলেই সেটা বিশ্বাস না করতে। তাদের মনে এই প্রশ্নটা গেঁথে দিন, “এটা কি আসলেই সত্যি?”

যখন আপনার সন্তান কোনো অদ্ভুত খবর নিয়ে আপনার কাছে আসবে, তখন তাকে ধমক দেবেন না বা “এসব ফালতু কথা” বলে উড়িয়ে দেবেন না। বরং তার সাথে কথা বলুন। তাকে জিজ্ঞেস করুন, “তুমি এটা কোথায় দেখেছ? তোমার কি মনে হয় এটা সত্যি হতে পারে?” এতে সে নিজে থেকে চিন্তা করার সুযোগ পাবে।

তথ্যের উৎস বা ‘সোর্স’ যাচাই করা শেখান

আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, “ফেসবুকে দেখেছি” বা “ইউটিউবে বলেছে” এটাই অনেকের কাছে খবরের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। সন্তানকে বোঝান যে, সব ভিডিও বা লেখা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তথ্যের উৎস বা সোর্স দেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

  • খবরটি কে দিয়েছে? কোনো পরিচিত পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল, নাকি অচেনা কোনো ব্যক্তি?
  • ভিডিওটি কবে আপলোড করা হয়েছে? অনেক সময় পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে গুজব ছড়ানো হয়।
  • অন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য জায়গায় এই খবরটি আছে কি না?

আপনি সন্তানকে বলতে পারেন, “বাবা, চলো তো আমরা একটু গুগল করে দেখি বড় কোনো পত্রিকা বা টিভিতে এই খবরটা দিয়েছে কি না। যদি না দিয়ে থাকে, তাহলে সম্ভবত এটা ভুল।”

আবেগের ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন করা

বেশিরভাগ ভুল তথ্য বা গুজব এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন মানুষ ভয় পায় অথবা খুব রেগে যায়। শিশুদের মনে ভয় খুব দ্রুত কাজ করে। যেমন—”অমুক খাবার খেলে অসুখ হবে” বা “কাল থেকে স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে”—এধরণের খবরে শিশুরা বিচলিত হয়ে পড়ে।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে আট বছরের তাহসান খুব ভয়ে ভয়ে মাকে বলল, “মা, আমি আর নুডলস খাবো না। ইউটিউবে দেখেছি নুডলস খেলে পেটে পাথর হয়!” মা হাসাহাসি না করে তাহসানকে পাশে বসালেন। তিনি বললেন, “চলো তো বাবা, আমরা একজন ডাক্তারের ভিডিও দেখি বা ডাক্তারি বইতে কী লেখা আছে পড়ি।” মা তাকে বুঝিয়ে বললেন যে, ভিডিওগুলো অনেক সময় ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন ভয় দেখানো কথা লেখে। তাহসানের ভয় কাটল এবং সে শিখল যে ভয় দেখানো ভিডিও সবসময় সত্যি হয় না।

সন্তানকে বোঝান যে, কোনো খবর দেখে যদি খুব বেশি ভয় লাগে বা রাগ হয়, তাহলে থামতে হবে। সাথে সাথে সেটা বিশ্বাস করা বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা যাবে না।

হেডলাইন দেখে বিচার না করা

ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই চটকদার থাম্বনেইল বা হেডলাইন ব্যবহার করা হয় যা ভেতরের ভিডিওর সাথে মেলে না। একে বলা হয় ‘ক্লিকবাইট’। বাচ্চারা ছবি দেখেই সিদ্ধান্তে চলে আসে। তাদের শেখান যে, বাইরের ছবি আর ভেতরের ঘটনা এক নাও হতে পারে।

তাদের বলতে পারেন, “বাইরের ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে অনেক বড় কিছু ঘটেছে, কিন্তু চলো পুরো ভিডিওটা দেখে বুঝি আসলে কী বলা হচ্ছে।”

বড়দের সম্মান রেখে সত্য জানানো

আমাদের যৌথ পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে অনেক সময় বয়োজ্যেষ্ঠরা না বুঝে হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে আসা ভুল তথ্য বিশ্বাস করেন এবং শেয়ার করেন। সন্তানকে শেখান যে, বড়রা ভুল তথ্য দিলে তাদের অপমান করা যাবে না। বরং বিনয়ের সাথে সত্যটা তুলে ধরতে হবে।

যেমন, আপনার সন্তান বলতে পারে, “দাদু, এই খবরটা মনে হয় পুরোপুরি ঠিক না, আমি আরেক জায়গায় অন্যরকম দেখেছি। তুমি কি একটু দেখবে?” এতে করে সে পারিবারিক শিষ্টাচার বজায় রেখেও সত্যের পক্ষে থাকতে শিখবে।

শেষ কথা

সন্তানকে ভুল তথ্য চেনার উপায় শেখানো একদিনের কাজ নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আপনি নিজে যখন কোনো খবর যাচাই করবেন, তখন সন্তানকে পাশে রাখুন এবং তাকে দেখান আপনি কীভাবে সত্যতা যাচাই করছেন। বাচ্চারা উপদেশের চেয়ে উদাহরণ থেকে বেশি শেখে।

ইন্টারনেটের এই বিশাল জগতে সন্তানকে একা ছেড়ে না দিয়ে তাকে সঠিক পথ দেখান। আপনার একটু সচেতনতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনাই পারে আপনার সন্তানকে একজন বুদ্ধিমান ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। ভুল তথ্যের ভিড়ে সে যেন হারিয়ে না যায়, তার জন্য আজ থেকেই ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন।

 

লেখাটি শেয়ার করুন: 

লেখালেখি হোক

ছানাপোনার সাথে

সচরাচর জিজ্ঞসা

সচরাচর জিজ্ঞসা

লেখকের জন্য সচরাচর জিজ্ঞাসা

আপনি ছানাপোনায় লিখতে চান? আমাদের লেখকরা সাধারনত যে ধরনের প্রশ্ন করে থাকে, সেগুলোর কয়েকটি এখানে আছে।  

ছানাপোনায় সাধারনত শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও  বেড়ে ওঠা সংক্রান্ত যে কোন ধরনের লেখা প্রকাশিত হয়।