শিশুদের ইন্টারনেট সচেতনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে করণীয়

নিয়মিত আপনার মেইলে লেখা পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

নিবন্ধটিতে যা যা থাকছে

আজকাল বাচ্চাদের হাতে হাতে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট। ওরা খুব সহজেই ছবি তোলে, ভিডিও বানায় আর মুহূর্তের মধ্যে সেটা ফেসবুকে বা ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করে দেয়। এটা ওদের কাছে নিছক আনন্দের মনে হলেও, ইন্টারনেটের জগতে একবার কিছু চলে গেলে সেটা যে আর পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না, এই বোধটা ওদের মধ্যে সবসময় থাকে না।

শিশুদের ইন্টারনেট সচেতনতা তাই এখনকার সময়ে বাবা-মায়ের জন্য খুব বড় একটা দুশ্চিন্তার বিষয়। না বুঝে একটা ভুল পোস্ট, কমেন্ট বা ছবি শেয়ার করলে সেটা বাচ্চার মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে, এমনকি সামাজিকভাবেও আপনাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। তাই পোস্ট করার আগে অন্তত কয়েক সেকেন্ড ভাবার অভ্যাসটা ছোট থেকেই সন্তানের মধ্যে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ইন্টারনেট কিছুই ভোলে না

বাচ্চারা মনে করে, স্ন্যাপচ্যাট বা স্টোরি থেকে ছবি তো ২৪ ঘণ্টা পর মুছে যাবে। কিন্তু ওদের সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে যে, কেউ যদি সেটার স্ক্রিনশট নিয়ে রাখে, তবে সেটা সারাজীবনের জন্য থেকে যেতে পারে। ডিজিটাল দুনিয়ায় কোনো কিছুই আসলে গোপন থাকে না বা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

ওকে ভয় দেখাবেন না, বরং বুঝিয়ে বলুন। যেমন বলতে পারেন, “বাবা, তুমি আজ যেটা পোস্ট করছ, সেটা যদি ৫ বছর পর তোমার স্কুলের হেড স্যার বা তোমার বস দেখেন, তখন কি তোমার খারাপ লাগবে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে সেটা পোস্ট না করাই ভালো।”

আবেগের বশে পোস্ট করা থেকে বিরত রাখা

টিনেজ বয়সে বা তার একটু আগে বাচ্চাদের আবেগের ওঠানামা খুব বেশি থাকে। হয়তো আপনার সাথে ঝগড়া হলো, কিংবা বন্ধুর সাথে মান-অভিমান হলো—ওরা সাথে সাথে সেই রাগ বা কষ্টের কথা স্ট্যাটাস হিসেবে দিয়ে দিতে চায়। এটা পরে ওদের জন্যই লজ্জার কারণ হতে পারে।

রিশাদের বয়স ১৩। সেদিন মায়ের ওপর রাগ করে ফেসবুকে একটা কড়া স্ট্যাটাস দিয়ে বসল। ১০ মিনিট পর রাগ কমলে সে বুঝতে পারল কাজটা ঠিক হয়নি, কিন্তু ততক্ষণে তার কাজিনরা আর স্কুলের বন্ধুরা সেটা দেখে ফেলেছে এবং নানা রকম প্রশ্ন করা শুরু করেছে। রিশাদ খুব লজ্জা পেল।

এই পরিস্থিতি এড়াতে সন্তানকে ‘২৪ ঘণ্টার নিয়ম’ শেখাতে পারেন। ওকে বলুন, “যখন খুব রাগ বা খুব বেশি আনন্দ হবে, তখন কোনো কিছু পোস্ট করবে না। মোবাইলের নোটপ্যাডে লিখে রাখো, কিন্তু পোস্ট করার আগে ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করো।” সাধারণত মাথা ঠান্ডা হলে ওরা নিজেই বুঝবে যে ঐ কথাগুলো সবার সামনে বলার মতো ছিল না।

অন্যের গোপনীয়তাকে সম্মান করা

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রায়ই যৌথ পরিবারে থাকি বা আত্মীয়-স্বজন সবসময় বাসায় আসা-যাওয়া করেন। বাচ্চারা হয়তো খেলার ছলে এমন কারো ছবি বা ভিডিও তুলে পোস্ট করে দিল যিনি হয়তো তখন অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিলেন। হয়তো খালামনি খাচ্ছেন, বা চাচু লুঙ্গি পরে সোফায় ঘুমিয়ে আছেন।</

সন্তানকে শেখাতে হবে যে, নিজের ছবি দিলেও অন্যের ছবি দেওয়ার আগে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। এটা ভদ্রতা এবং অন্যের সম্মানের বিষয়।

আপনি ওকে এভাবে প্র্যাকটিস করাতে পারেন:

  • “মামনি, তুমি যে দাদুর ছবিটা তুলেছ, দাদু কি জানেন যে তুমি এটা ফেসবুকে দিচ্ছ?”
  • “বন্ধুর এই হাসির ভিডিওটা দেওয়ার আগে ওকে একবার জিজ্ঞেস করে নাও ও কিছু মনে করবে কি না।”

‘নানি-দাদি’ টেস্ট

বাচ্চাদের জন্য একটা খুব সহজ ফিল্টার বা নিয়ম ঠিক করে দিতে পারেন, যাকে আমরা মজার ছলে ‘নানি-দাদি টেস্ট’ বলতে পারি। নিয়মটা খুব সরল—যে ছবি বা লেখা তুমি তোমার নানি, দাদি বা পরিবারের মুরুব্বিদের সরাসরি দেখাতে পারবে না, সেটা ইন্টারনেটেও দেওয়া যাবে না।

ইন্টারনেটকে একটা বিশাল ড্রয়িং রুমের মতো ভাবতে শেখান, যেখানে পরিচিত-অপরিচিত সবাই বসে আছে। সেখানে কি আমরা যা খুশি তাই করতে পারি? নিশ্চয়ই না। এই উদাহরণটা ওদের বুঝতে সাহায্য করবে যে পাবলিক প্ল্যাটফর্মে আচরণের একটা সীমা থাকা দরকার।

ভুল হলে বকাবকি নয়

এত কিছু শেখানোর পরেও বাচ্চারা ভুল করবে, এটাই স্বাভাবিক। হয়তো কোনো বাজে কমেন্ট করে ফেলবে বা অনুপযুক্ত ছবি শেয়ার করবে। তখন যদি আপনি অতিরিক্ত বকাবকি করেন বা ফোন কেড়ে নেন, তবে পরের বার বিপদ হলে ও আর আপনার কাছে আসবে না।

যদি দেখেন ও ভুল কিছু পোস্ট করেছে, শান্তভাবে ওকে পাশে বসান। বলুন, “বাবা, এই পোস্টটা দেখে অনেকে ভুল বুঝতে পারে। চলো আমরা এটা ডিলিট করে দেই এবং কেন এটা ঠিক হয়নি সেটা নিয়ে কথা বলি।” আপনার উদ্দেশ্য হলো ওকে ভয় দেখানো নয়, বরং শিশুদের ইন্টারনেট সচেতনতা তৈরি করা যেন ও নিজেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

শেষ কথা

সন্তানকে ইন্টারনেটের জগত থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা এখন আর সম্ভব নয়, আর সেটা উচিতও নয়। প্রযুক্তির সাথে ওদের মানিয়ে নিতে হবেই। কিন্তু এই বিশাল জগতটা যেন ওদের জন্য নিরাপদ থাকে, তার জন্য ‘ভাবনা-চিন্তা করে পা ফেলা’ বা ‘থিংক বিফোর ইউ ক্লিক’ এর মানসিকতা তৈরি করে দেওয়াটাই আমাদের দায়িত্ব।

আপনার সন্তানের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। ওদের বন্ধু হয়ে পাশে থাকুন। যখন ওরা বুঝবে যে আপনি ওদের ভালোর জন্যই বলছেন এবং ভুল হলে জাজ করবেন না, তখন ওরা নিজেরাই অনলাইনে অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করবে।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

লেখালেখি হোক

ছানাপোনার সাথে

সচরাচর জিজ্ঞসা

সচরাচর জিজ্ঞসা

লেখকের জন্য সচরাচর জিজ্ঞাসা

আপনি ছানাপোনায় লিখতে চান? আমাদের লেখকরা সাধারনত যে ধরনের প্রশ্ন করে থাকে, সেগুলোর কয়েকটি এখানে আছে।  

ছানাপোনায় সাধারনত শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও  বেড়ে ওঠা সংক্রান্ত যে কোন ধরনের লেখা প্রকাশিত হয়।