বর্তমান সময়ে বাবা-মায়ের জন্য অন্যতম বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো সন্তানদের স্ক্রিন আসক্তি, বিশেষ করে ইউটিউব। শহুরে জীবনে ছোট ফ্ল্যাটে বন্দি থাকা এবং খেলার সাথীর অভাবের কারণে বাচ্চারা সহজেই মোবাইলের রঙিন দুনিয়ায় ডুবে যাচ্ছে। অনেক অভিভাবকই জানতে চান, বাচ্চাদের ইউটিউব দেখা বন্ধ করার উপায় কী এবং কীভাবে তাদের এই ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তব জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়। এটি কেবল চোখের সমস্যার বিষয় নয়, বরং শিশুর মানসিক বিকাশ, মনোযোগ এবং সামাজিক আচরণের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
এই নির্দেশিকাটিতে আমরা আলোচনা করব কীভাবে ধাপে ধাপে এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাচ্চার ইউটিউব দেখার অভ্যাস কমানো যায়। এখানে আমরা বকাবকি বা জোর করে ফোন কেড়ে নেওয়ার বদলে, সন্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজব। পুরো লেখাটি পড়লে আপনি কিছু বাস্তবিক কৌশল শিখতে পারবেন যা আপনার এবং আপনার সন্তানের নিত্যদিনের জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
হঠাৎ করে ফোন কেড়ে নেবেন না
বাচ্চা যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কার্টুন বা ভিডিও দেখে, তখন রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু হুট করে হাত থেকে ফোন কেড়ে নেওয়া বা ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এতে বাচ্চার মনে জেদ তৈরি হয় এবং সে লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করে। মনে রাখবেন, ইউটিউব দেখার সময় বাচ্চার মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ হয় যা তাকে আনন্দ দেয়। হঠাৎ এই আনন্দ কেড়ে নিলে সে অস্থির হয়ে পড়ে।
এর বদলে সময়সীমা নির্ধারণ করুন। তাকে বুঝিয়ে বলুন যে, “তুমি প্রতিদিন ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা দেখার সুযোগ পাবে, কিন্তু তার বেশি নয়।” এই নিয়মটি বাসার সবার জন্য প্রযোজ্য হতে হবে। আপনি যদি নিজে সারাদিন ফোনে থাকেন, তবে বাচ্চাকে নিষেধ করা কঠিন হবে।
বাচ্চার একঘেয়েমি দূর করার ব্যবস্থা করুন
বেশিরভাগ সময় বাচ্চারা ইউটিউব দেখে কারণ তাদের আর কিছু করার থাকে না। স্কুল, কোচিং আর হোমওয়ার্কের চাপের বাইরে তাদের বিনোদনের মাধ্যম খুব সীমিত। তাই ইউটিউবের বিকল্প হিসেবে তাকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখা জরুরি।
- বাচ্চার সাথে লুডু, ক্যারাম বা দাবা খেলুন।
- তাকে নিয়ে বারান্দায় বাগান পরিচর্যা করুন বা বিকেলে ছাদে হাঁটতে যান।
- ড্রয়িং খাতা ও রং পেন্সিল কিনে দিন, তাকে আঁকতে উৎসাহিত করুন।
- গল্পের বই পড়ে শোনান বা তার সাথে গল্প করুন।
বাস্তব উদাহরণ: কী বলবেন আর কী করবেন
বাচ্চাকে শাসন করার সময় আমরা প্রায়ই নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করি, যা হিতে বিপরীত হয়। বাচ্চার সাথে কথা বলার ভঙ্গি পরিবর্তন করলে অনেক সময় ভালো ফল পাওয়া যায়। নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:
যা বলবেন না
“সারাদিন শুধু ফোন আর ফোন! তোমার চোখ নষ্ট হয়ে যাবে। এখনই ফোন রাখো নইলে আমি আছাড় মারব।”
যা বলতে পারেন
“বাবা/মা, আমি দেখছি তুমি অনেকক্ষণ ধরে ভিডিও দেখছো। আমার মনে হয় এখন একটু বিরতি নেওয়া দরকার। এসো, আমরা দুজনে মিলে বিকেলের নাস্তা বানাই বা একটু ব্লকস দিয়ে খেলি।”
যখন আপনি তাকে কোনো কাজে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান, তখন সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং ফোনের কথা ভুলে যাওয়ার সুযোগ পায়।
ঘরের কাজে বাচ্চাকে যুক্ত করা
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মায়েরা সাধারণত সংসারের সব কাজ একাই করেন এবং বাচ্চাকে দূরে রাখেন যেন তারা বিরক্ত না করে। কিন্তু বাচ্চাকে ছোটখাটো কাজে সাহায্য করতে বললে তাদের স্ক্রিন টাইম কমে যায়।
সায়ানের বয়স পাঁচ বছর। স্কুল থেকে ফিরেই সে মায়ের ফোনটা নিয়ে সোফায় বসে যেত। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতেন। একদিন মা ফোন না দিয়ে সায়ানকে ডাকলেন, “বাবা, আজ আমি একা পারছি না, তুমি কি আমাকে মটরশুঁটিগুলো ছিলে দিতে পারবে?” প্রথমে সায়ান একটু অনিচ্ছা দেখাল, কিন্তু কাজটা করতে গিয়ে সে মায়ের সাথে গল্প শুরু করল। সেদিন বিকেলে সে আর ফোনের কথা মনেই করল না। এই ছোট ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সঙ্গ পেলে বাচ্চারা ইউটিউব ভুলে থাকতে পারে।
এভাবে কাপড় ভাঁজ করা, ঘর গোছানো বা খাবার টেবিলে পানি এগিয়ে দেওয়ার মতো কাজে তাদের যুক্ত করুন। এতে তাদের দায়িত্ববোধ বাড়ে এবং ফোনের প্রতি আকর্ষণ কমে।
পরিবারের বড়দের ভূমিকা
যৌথ পরিবারে অনেক সময় দাদা-দাদি বা অন্য আত্মীয়রা বাচ্চাকে কান্না থামালে ফোন দিয়ে দেন। এটি বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর। আপনাকে বিনীতভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদের বোঝাতে হবে। তাদের বলুন, “বাচ্চা কাঁদলে ফোন না দিয়ে আপনারা যদি ওকে কোনো গল্প বলেন বা ছড়া শোনান, তবে ওর জন্য অনেক ভালো হবে।” সবাই মিলে একমত না হলে বাচ্চাদের ইউটিউব দেখা বন্ধ করার উপায়গুলো কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ কথা
বাচ্চার ইউটিউব আসক্তি একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এটি একদিনে যাবেও না। ধৈর্য ধরুন এবং সন্তানের ওপর রাগ না করে তাকে সঙ্গ দিন। আপনার একটু বাড়তি সময় এবং মনোযোগই পারে তাকে ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তব জীবনে ফিরিয়ে আনতে। মনে রাখবেন, কড়াকড়ি করে সাময়িক ফল পাওয়া গেলেও, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান এনে দেবে।
আজ থেকেই ছোট ছোট পরিবর্তন শুরু করুন। হয়তো প্রথম কয়েকদিন বাচ্চা কান্নাকাটি বা জেদ করবে, কিন্তু আপনি শান্ত থেকে নিয়ম মেনে চললে ধীরে ধীরে তার অভ্যাসে পরিবর্তন আসবেই। শুভকামনা আপনার এবং আপনার সন্তানের জন্য।






