বিকেলের নাস্তা খাওয়ার সময় হয়তো লক্ষ্য করলেন আপনার সন্তান একমনে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনি ডাকলেন, সে শুনলো না। কাছে গিয়ে দেখলেন সে এমন কোনো ভিডিও বা গেম দেখছে যা তার বয়সের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। বুকটা ধক করে উঠলো আপনার, তাই না? কিংবা হয়তো আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে গিয়েছেন, সেখানে বাচ্চারা সব একজোট হয়ে ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড নিয়ে ব্যস্ত। কার ফোনে কী আসছে, কে কী দেখছে—এসব নিয়ে আপনার মনে একটা অজানা আতঙ্ক কাজ করে। এই দৃশ্যগুলো এখন আমাদের বাংলাদেশের ঘরে ঘরে খুব পরিচিত।
প্রযুক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। স্কুলের হোমওয়ার্ক, অনলাইন ক্লাস, কিংবা কার্টুন দেখে একটু অবসর সময় কাটানো—সবকিছুর জন্যই ইন্টারনেটের দরকার হয়। তাই চাইলেই সন্তানের হাত থেকে ডিভাইস কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়, আর সেটা উচিতও নয়। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আপনার চিন্তার জায়গাটা হলো—অনলাইনে শিশুর নিরাপত্তা। ইন্টারনেটের এই বিশাল জগতে ভালো যেমন আছে, তেমনি মন্দেরও অভাব নেই। ভয়ের কিছু নেই, খুব কঠিন কোনো প্রযুক্তিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাধারণ কিছু সতর্কতা আর সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেই আপনি তাকে এই ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপদ রাখতে পারবেন।
ডিজিটাল দুনিয়া আর আমাদের বাস্তবতা
শুরুতেই মেনে নিতে হবে যে, আমাদের ছোটবেলার খেলার মাঠ আর আজকের শিশুদের খেলার মাঠ এক নয়। এখনকার বাচ্চারা মাঠে যতটা না খেলে, তার চেয়ে বেশি সময় কাটায় স্ক্রিনে। এটা যুগের চাহিদা। কিন্তু সমস্যা হলো, ইন্টারনেটে কোনো দারোয়ান নেই। একটা সাধারণ কার্টুন দেখতে দেখতেই পাশে এমন সব বিজ্ঞাপন বা ভিডিও চলে আসতে পারে যা বাচ্চার মনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক সময় আমরা ভাবি, বাচ্চা তো ঘরেই আছে, চোখের সামনেই সোফায় বসে ট্যাব বা ফোন দেখছে, তাহলে আর ভয়ের কী আছে? কিন্তু শারীরিকভাবে সে ঘরে থাকলেও, মানসিকভাবে সে হয়তো এমন কোনো জগতে বিচরণ করছে যেখানে আপনি তার হাত ধরে নেই। তাই ঘরের বাইরের নিরাপত্তার মতো অনলাইনের নিরাপত্তা নিয়েও আমাদের সচেতন হতে হবে।
খোলামেলা কথা বলা জরুরি
অনলাইনে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ‘গল্প করা’। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। আপনি যদি পুলিশি কায়দায় নজরদারি করেন, তবে সন্তান আপনার কাছ থেকে লুকাবে। কিন্তু যদি বন্ধুর মতো কথা বলেন, তবে সে নিজেই আপনাকে সব জানাবে।
কীভাবে কথা শুরু করবেন?
বাচ্চাকে ধমক দিয়ে নয়, কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করুন। ধরুন, সে কোনো গেম খেলছে। আপনি পাশে বসে বলতে পারেন:
- “বাবা, তুমি যে গেমটা খেলছো, ওটা আমাকে একটু শেখাবে? আমি তো পারি না।”
- “আজকে ইউটিউবে মজার কিছু দেখলে? আমাকে দেখাও তো, আমিও একটু হাসি।”
যখন সন্তান দেখবে আপনি তার আগ্রহের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তখন সে আপনাকে তার অনলাইন জগত সম্পর্কে জানাতে ভয় পাবে না। তাকে বোঝান যে, ইন্টারনেটে সবাই বন্ধু নয়। অপরিচিত কেউ নাম-ঠিকানা বা স্কুলের নাম জানতে চাইলে যে বলা যাবে না, এটা গল্পের ছলে বুঝিয়ে বলুন।
একটা ছোট ঘটনার কথা বলি। আট বছরের রিহান একদিন তার মাকে এসে বললো, “আম্মু, আমার অনলাইন ফ্রেন্ড আমাকে একটা গিফট পাঠাতে চায়, আমাদের বাসার ঠিকানাটা দাও না?” রিহানের মা চমকে উঠলেন, কিন্তু রাগ করলেন না। তিনি শান্তভাবে রিহানকে বুঝিয়ে বললেন, “বাবা, আমরা যেমন রাস্তায় অপরিচিত কারো দেওয়া চকলেট খাই না, তেমনি অনলাইনেও অপরিচিত কাউকে বাসার কথা বলতে নেই।” মা যদি সেদিন বকাঝকা করতেন, হয়তো রিহান পরেরবার লুকিয়ে ঠিকানা দিয়ে দিত।
কিছু নিয়ম বা ‘চুক্তি’ ঠিক করে নিন
বাঙালির সংসারে সবকিছুর একটা নিয়ম থাকে। কখন পড়তে বসবে, কখন গোসল করবে। ঠিক তেমনি ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্যও কিছু নিয়ম থাকা দরকার। এটাকে আমরা ‘পারিবারিক চুক্তি’ বলতে পারি।
১. সময় নির্ধারণ: দিনের ২৪ ঘণ্টাই ইন্টারনেট খোলা রাখবেন না। পড়াশোনা আর খেলাধুলার সময় বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু সময় দিন। যেমন—বিকেলে ১ ঘণ্টা বা ছুটির দিনে ২ ঘণ্টা।
২. ডিভাইস ব্যবহারের স্থান: এটা খুব জরুরি। চেষ্টা করবেন সন্তান যেন তার শোবার ঘরে দরজা বন্ধ করে ইন্টারনেট ব্যবহার না করে। ড্রইংরুমে বা সবার চোখের সামনে বসে ব্যবহার করার নিয়ম চালু করুন। দাদা-দাদি বা বাসার অন্যদের সামনে ব্যবহার করলে নজরদারিটা সহজ হয় এবং বাচ্চা নিজেও সতর্ক থাকে।
প্রযুক্তিগত কিছু ছোট সতর্কতা
আপনি হয়তো ভাবছেন, “আমি তো বাপু এত টেকনিক্যাল বিষয় বুঝি না।” বিশ্বাস করুন, খুব বেশি বোঝার দরকার নেই। আপনার স্মার্টফোনেই কিছু সহজ অপশন আছে যা অনলাইনে শিশুর নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করে।
- সেফ সার্চ বা কিডস মোড: ইউটিউব বা গুগলে ‘সেফ সার্চ’ অপশন চালু করে দিন। ছোটদের জন্য আলাদা ইউটিউব অ্যাপ পাওয়া যায়, যেখানে শুধু বাচ্চাদের কন্টেন্ট থাকে। চেষ্টা করুন সেগুলো ব্যবহার করতে।
- পাসওয়ার্ড নিজের কাছে রাখা: অ্যাপ স্টোর বা প্লে স্টোরের পাসওয়ার্ড আপনার কাছে রাখুন। এতে করে বাচ্চা চাইলেই হুট করে কোনো নতুন গেম বা অ্যাপ নামাতে পারবে না। তাকে বলতে হবে, “কিছু নামাতে হলে আম্মু বা আব্বুকে আগে দেখাতে হবে।”
আপনি যখন নিজেই উদাহরণ
বাচ্চারা শুনে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে দেখে। আপনি যদি অফিস থেকে ফিরে রাত পর্যন্ত ফেসবুকে স্ক্রল করতে থাকেন, আর সন্তানকে বলেন “ফোন রাখো”, তাহলে কি কাজ হবে? হবে না।
বাসায় একটা ‘নো-ফোন জোন’ বা ‘নো-ফোন টাইম’ তৈরি করুন। যেমন, রাতের খাবারের সময় বা ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে পরিবারের কেউ ফোন ধরবে না—বাবা-মাও না। আপনি যখন বই পড়বেন বা পরিবারের সাথে গল্প করবেন, সন্তানও বুঝবে যে ফোনের বাইরেও একটা সুন্দর জগত আছে।
বাস্তব জীবনের অনুশীলন (রিয়েল লাইফ মডেলিং)
ধরুন, আপনার সন্তান হঠাৎ এসে বায়না ধরলো সে একটা নতুন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ ব্যবহার করতে চায় যা তার বন্ধুরা ব্যবহার করছে। তখন আপনি কী করবেন? সরাসরি “না” বলে দিলে সে বিদ্রোহ করতে পারে।
কী বলবেন:
“আচ্ছা মা/বাবা, আমি বুঝতে পারছি তুমি বন্ধুদের সাথে কানেক্টেড থাকতে চাও। চলো আমরা দুজনে মিলে অ্যাপটা দেখি। যদি দেখি এটা নিরাপদ এবং আমাদের পরিবারের নিয়মের সাথে যায়, তাহলে ভেবে দেখবো। আর যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে আমরা অন্য কোনো মজার উপায় বের করবো।”
সন্তানের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে:
প্রথমে হয়তো সে একটু মন খারাপ করবে। কিন্তু যখন দেখবে আপনি তার কথা সরাসরি ফেলে দেননি বরং যাচাই করছেন, তখন সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাববে। এই প্রক্রিয়ায় সে শিখবে যে অনলাইনে সব কিছুই নিরাপদ নয় এবং যাচাই-বাছাই করাটা জরুরি।
শেষ কথা
প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালন কোনো পরীক্ষার খাতা নয় যে আপনাকে ১০০ তে ১০০ পেতে হবে। ভুল হবে, আবার শুধরে নেবেন। অনলাইনে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একদিনের কাজ নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রযুক্তিকে শত্রু না ভেবে, একে কীভাবে সন্তানের বিকাশে কাজে লাগানো যায়, সেদিকে নজর দিন।
সবচেয়ে বড় কথা হলো সন্তানের সাথে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা। সে যেন কোনো ভুল করে ফেললে বা অনলাইনে ভয়ের কিছু দেখলে সবার আগে দৌড়ে আপনার কাছেই আসে, ভয়ে লুকিয়ে না রাখে। আপনার একটু সচেতনতা আর ভালোবাসাই পারে ডিজিটাল দুনিয়ার এই গোলকধাঁধায় আপনার সোনামণিকে নিরাপদে রাখতে। ভালো থাকুন, সন্তানকে নিয়ে নিরাপদে থাকুন।





