শিশুকে গুজব বা ভুয়া খবর সম্পর্কে সচেতন করবেন কিভাবে

নিয়মিত আপনার মেইলে লেখা পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

নিবন্ধটিতে যা যা থাকছে

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের সন্তানদের হাতের মুঠোয় পুরো পৃথিবী। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা টেলিভিশনের পর্দায় তারা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের তথ্য দেখছে এবং শুনছে। এর মধ্যে অনেক খবরই সত্য, আবার অনেক কিছুই সম্পূর্ণ বানোয়াট বা গুজব। ছোটরা সাধারণত যা দেখে বা শোনে, তা খুব সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে। তাদের কোমল মনে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করার মতো বিচারবুদ্ধি পুরোপুরি তৈরি হয় না বলে তারা বিভ্রান্তির শিকার হতে পারে।

ভুয়া খবর বা গুজব সন্তানের মনে অহেতুক ভয় বা ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। এটি তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি অনেক সময় বড় কোনো বিপদও ডেকে আনতে পারে। তাই সন্তানকে সঠিক তথ্য যাচাই করতে শেখানো এবং গুজবের বিষয়ে সচেতন করা এখন বাবা-মায়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোটবেলা থেকেই যদি তাদের মধ্যে প্রশ্ন করার এবং সত্য খোঁজার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, তবে ভবিষ্যতে তারা আরও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

গুজব বা ভুয়া খবর আসলে কী?

সন্তানকে খুব সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে যে গুজব হলো এমন কোনো কথা বা খবর, যার কোনো সঠিক প্রমাণ নেই। একে অনেকটা ‘কানাকানি’ খেলার সাথে তুলনা করতে পারেন। একজনের কথা আরেকজন যখন শুনে শুনে বলে, তখন আসল ঘটনা অনেক সময় বদলে যায়। ইন্টারনেটের যুগে এই বদলানো খবরটিই খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যাকে আমরা ‘ভাইরাল’ হওয়া বলি।

বাচ্চাদের বলুন যে, ইন্টারনেটে বা ইউটিউবে যা দেখা যায়, তার সব কিছুই সত্যি নয়। কেউ কেউ মজা করার জন্য, আবার কেউ কেউ মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য বা নিজেদের ভিডিওতে বেশি ভিউ পাওয়ার জন্য মিথ্যা খবর বানায়। যেমন ধরুন, কোনো এক ইউটিউব থাম্বনেইলে দেখা গেল অদ্ভুত কোনো প্রাণী বা ভয়ংকর কোনো ঝড়ের খবর, যা বাস্তবে ঘটেইনি।

কেন মানুষ ভুল খবর ছড়ায়?

বাচ্চারা প্রায়ই প্রশ্ন করে, “মা, মানুষ কেন মিথ্যা কথা ইন্টারনেটে দেয়?” এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জরুরি। তাদের বুঝিয়ে বলুন যে, এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে।

  • মনযোগ আকর্ষণ: অনেকে চায় মানুষ তাদের ভিডিও বা লেখা বেশি বেশি দেখুক। তাই তারা চমকপ্রদ কিন্তু মিথ্যা শিরোনাম ব্যবহার করে।
  • ভুল বোঝাবুঝি: অনেক সময় মানুষ না জেনেই ভুল তথ্য শেয়ার করে। যেমন, আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন বা মুরব্বিরা হোয়াটসঅ্যাপে বা ফেসবুকে স্রেফ ভালো মনে করে অনেক স্বাস্থ্য টিপস শেয়ার করেন যা আসলে বিজ্ঞানসম্মত নয়।
  • ভয় দেখানো: কিছু মানুষ অকারণে সমাজে ভয় ছড়াতে পছন্দ করে।

বাস্তব জীবনের উদাহরণ ও ছোট গল্প

আসুন একটি পরিচিত দৃশ্য কল্পনা করি। আপনার সন্তান স্কুল থেকে ফিরে এসে খুব উত্তেজিত হয়ে বলল, “বাবা, জানো? আগামী সপ্তাহে নাকি সব স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে! ইউটিউবে দেখেছি, ভয়াবহ ভূমিকম্প হবে!”

এই মুহূর্তে আপনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? ধমক দিয়ে বলবেন না যে, “এসব ফালতু কথা কোথায় পাও?” এতে সে আপনার কাছে আর কিছু শেয়ার করতে চাইবে না। বরং এটি একটি শিক্ষণীয় মুহূর্ত হিসেবে গ্রহণ করুন।

“বাবা/মা, এসো আমরা দুজনে মিলে দেখি খবরটা আসলে সত্যি কি না। আমরা নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদপত্রের ওয়েবসাইট বা টেলিভিশনের খবরে দেখব এমন কিছু বলা হয়েছে কি না। যদি সেখানে না থাকে, তার মানে এটি একটি গুজব।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরীক্ষার রুটিন পরিবর্তন বা প্রশ্নফাঁস নিয়ে প্রায়ই নানা গুজব ছড়ায়। কোচিং সেন্টারের বড় ভাইয়া বা বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা এসব খবর যাচাই না করে বিশ্বাস করলে যে ক্ষতি হতে পারে, তা সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন।</ পড়ুন>

সন্দেহ করতে শেখান, অবিশ্বাস নয়

<pকিভাবে বুঝবে কোনটা গুজব? সন্তানকে কিছু ‘গোয়েন্দাগিরি’ বা যাচাই করার কৌশল শিখিয়ে দিন। তাকে বলুন কোনো খবর বিশ্বাস করার আগে নিজেকে কিছু প্রশ্ন করতে:

  • খবরটি কে দিয়েছে? এটা কি কোনো পরিচিত টিভি চ্যানেল বা পত্রিকার খবর, নাকি অচেনা কোনো ফেসবুক পেজ?
  • খবরটি কবেকার? অনেক সময় ৫ বছর আগের কোনো ঘটনার ভিডিও এখনকার বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। তারিখ চেক করা শেখান।
  • অন্য কোথাও কি এই খবর আছে? যদি ঘটনাটি সত্যি অনেক বড় হয়, তবে সব চ্যানেলেই তা দেখাবে। শুধু একটি জায়গায় কেন?

প্যারেন্টিং টিপস: মুরব্বিদের সম্মান রেখে কথা বলা

অনেক সময় পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা, যেমন দাদা-দাদি বা নানা-নানি, ফেসবুকে দেখা কোনো ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি বা কুসংস্কার বিশ্বাস করতে পারেন। সন্তানকে শেখান যে, বড়দের অসম্মান না করেও দ্বিমত পোষণ করা যায়। সন্তানকে বলতে পারেন, “দাদি তোমাকে ভালোবাসেন বলেই এই টোটকাটার কথা বলেছেন, কিন্তু এসো আমরা ডাক্তার আঙ্কেলের বইয়ে দেখি বা ইন্টারনেটে ভালো কোনো ডাক্তার কী বলছেন তা শুনি।” এতে বড়দের সম্মানও থাকে, আবার সন্তানও সঠিক তথ্যটি শেখে।

সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম সম্পর্কে ধারণা দিন

এখনকার বাচ্চারা খুব ছোট বয়স থেকেই ইউটিউব শর্টস বা রিলস দেখে। তাদের সহজ ভাষায় বোঝান যে, তুমি যদি একবার কোনো ভয়ের ভিডিও দেখো, তবে ইউটিউব তোমাকে বারবার ওই একই রকম ভিডিও দেখাতে থাকবে। এটা মেশিনের কাজ, তার মানে এই নয় যে পৃথিবীটা ভয়ের জায়গা।

যখন তারা কোনো সেনসেশনাল বা চাঞ্চল্যকর খবর নিয়ে আপনার কাছে আসবে, তখন তাদের সাথে বসে সেই খবরটির সত্যতা যাচাই করুন। এই প্রক্রিয়াটি তাদের মধ্যে ‘ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং’ বা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি করবে।

শেষ কথা

সন্তানকে গুজব বা ভুয়া খবর বোঝানো একদিনের কাজ নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের চারপাশের জগত এখন তথ্যে ঠাসা, সেখানে সঠিক আর ভুলের মিশেল থাকবেই। বাবা-মা হিসেবে আপনার কাজ হলো সন্তানের জন্য ফিল্টার হিসেবে কাজ করা এবং ধীরে ধীরে তাদের নিজেদের ফিল্টার তৈরি করতে সাহায্য করা।

হয়তো মাঝে মাঝে তারা ভুল খবর বিশ্বাস করে ভয় পাবে বা বিভ্রান্ত হবে। তখন ধৈর্য না হারিয়ে তাদের পাশে থাকুন। আপনার শান্ত এবং যৌক্তিক আলোচনাই তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। মনে রাখবেন, আজকের এই ছোট ছোট শিক্ষাগুলোই তাদের ভবিষ্যতে ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপদ রাখতে সাহায্য করবে।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

লেখালেখি হোক

ছানাপোনার সাথে

সচরাচর জিজ্ঞসা

সচরাচর জিজ্ঞসা

লেখকের জন্য সচরাচর জিজ্ঞাসা

আপনি ছানাপোনায় লিখতে চান? আমাদের লেখকরা সাধারনত যে ধরনের প্রশ্ন করে থাকে, সেগুলোর কয়েকটি এখানে আছে।  

ছানাপোনায় সাধারনত শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও  বেড়ে ওঠা সংক্রান্ত যে কোন ধরনের লেখা প্রকাশিত হয়।