শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন কিভাবে

নিয়মিত আপনার মেইলে লেখা পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

নিবন্ধটিতে যা যা থাকছে

সন্ধ্যাবেলা কাজ থেকে ফিরে আপনি হয়তো একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন, কিংবা রাতের রান্নার তোড়জোড় চলছে। ওদিকে ড্রয়িংরুমে বা শোবার ঘরে আপনার সন্তান একমনে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ঘরটা শান্ত, কোনো ঝামেলা নেই। বাচ্চা কার্টুন বা ভিডিও দেখছে, আর আপনিও নিশ্চিন্তে নিজের কাজগুলো গুছিয়ে নিতে পারছেন। কিন্তু এই ‘শান্ত’ পরিবেশটার আড়ালে কি কোনো দুশ্চিন্তা কাজ করে না আপনার মনে? মাঝে মাঝে কি মনে হয় না, ও আসলে কী দেখছে? বা যা দেখছে তা ওর বয়সের জন্য ঠিক তো?

এই দুশ্চিন্তা কিন্তু একা আপনার নয়, আজকের দিনে আমাদের মতো সব বাবা-মায়েরই এই এক চিন্তা। প্রযুক্তির যুগে শিশুদের ইন্টারনেট থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সব কিছু অবাধে দেখতে দেওয়াও নিরাপদ নয়। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন প্যারেন্টিংয়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের আড্ডায় আমরা কাউকে দোষারোপ করব না, বরং একদম ঘরোয়াভাবে জানার চেষ্টা করব—কীভাবে বুঝবেন আপনার সন্তান অনলাইনে নিরাপদ আছে কি না এবং কীভাবে ওর জন্য সঠিক কনটেন্ট বা ভিডিও বাছাই করবেন।

ভিডিওর ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া শৈশব

একটা সময় ছিল যখন আমাদের শৈশব কাটত মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে, কিংবা বিকেলে ছাদে ঘুড়ি উড়িয়ে। কিন্তু এখনকার ফ্ল্যাটবাড়ির জীবনে বা সময়ের অভাবে বাচ্চাদের সেই সুযোগ খুব কম। অগত্যা বিনোদনের সঙ্গী হয়েছে স্মার্টফোন, ট্যাব বা স্মার্ট টিভি।

সমস্যাটা মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট নয়, সমস্যা হলো কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু। আপনি হয়তো ইউটিউবে একটা নিরীহ ছড়ার ভিডিও চালিয়ে দিয়ে কাজে গেলেন। কিন্তু খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, একটা ভিডিও শেষ হলে অটো-প্লে হয়ে পরেরটা শুরু হয়ে যায়। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে বিপদ। অনেক সময় কার্টুনের নাম করে এমন সব ভিডিও চলে আসে, যা হয়তো সহিংসতা শেখায়, কিংবা অদ্ভুত সব আচরণ করতে উৎসাহিত করে। বাচ্চার মনে এর প্রভাব পড়ে খুব গভীরভাবে।</*p>

নিরাপদ কনটেন্ট বাছবেন কীভাবে?

এখন প্রশ্ন হলো, এত হাজার হাজার ভিডিওর মধ্যে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ—সেটা বুঝবেন কীভাবে? এর জন্য আপনাকে টেক-এক্সপার্ট হতে হবে না। শুধু সাধারণ কিছু বিষয় খেয়াল করলেই চলবে।

১. ভাষা ও আচরণের দিকে নজর দিন

বাচ্চা যে কার্টুন বা ভিডিও দেখছে, সেখানকার চরিত্ররা কেমন ভাষায় কথা বলছে? তারা কি একে অপরকে সম্মান দিয়ে কথা বলছে, নাকি চিৎকার-চেঁচামেচি আর ঝগড়া করছে? অনেক সময় দেখা যায়, জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্রগুলোও একে অপরকে মারধর করছে বা ব্যঙ্গ করছে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। ভিডিওতে যা দেখে, বাস্তবেও তাই করতে চায়। তাই এমন কনটেন্ট বাছুন যেখানে বন্ধুত্ব, দয়া এবং শ্রদ্ধার শিক্ষা আছে।

২. ভয়ের উপাদান আছে কি না

অনেক সময় কার্টুনের আড়ালে ভূতের গল্প বা ভয়ানক গ্রাফিক্সের ভিডিও চলে আসে। আপনার বাচ্চা যদি রাতে হঠাৎ ভয় পায়, বা একা বাথরুমে যেতে না চায়, তবে খেয়াল করুন সে মোবাইলে কী দেখছে। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা মানে শুধু খারাপ মানুষ থেকে রক্ষা নয়, বরং মানসিক ভয়ভীতি থেকেও তাদের রক্ষা করা।

৩. বিজ্ঞাপনের ফাঁদ

ফ্রি অ্যাপ বা ভিডিওতে প্রচুর বিজ্ঞাপন আসে। এর মধ্যে অনেক বিজ্ঞাপনই বাচ্চাদের জন্য উপযোগী নয়। গেম খেলার সময় এমন সব অ্যাড আসে যা হয়তো বড়দের জন্য তৈরি। তাই যতটা সম্ভব অফলাইন ভিডিও বা প্রি-ডাউনলোড করা ভিডিও দেখানোর চেষ্টা করুন।

বাস্তব জীবনের একটি ঘটনা

সেদিন আমার এক পরিচিত ভাবি বলছিলেন তার ৫ বছরের ছেলে রিয়ানের কথা। রিয়ান এমনিতে খুব শান্ত। কিন্তু কিছুদিন ধরে সে হঠাৎ করেই রেগে যাচ্ছে এবং অদ্ভুত সব আওয়াজ করছে। ভাবি খেয়াল করলেন, রিয়ান ইউটিউবে গেমিং ভিডিও দেখে। সেখানে গেমাররা খেলার উত্তেজনায় চিৎকার করে, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে। রিয়ান সেটাই শিখছিল। ভাবি কিন্তু মোবাইল কেড়ে নেননি। তিনি রিয়ানের পাশে বসে বললেন, “বাবা, ওভাবে চিৎকার করলে তো গলা ব্যথা করবে। চলো আমরা এমন কিছু দেখি যেখানে সুন্দর গল্প আছে।”

এই ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, বাচ্চাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ওরা যা দেখে, তাই শেখে। আমাদের কাজ হলো ওদের সামনে সঠিক উদাহরণ তুলে ধরা।

মোবাইল কেড়ে নেওয়া কি সমাধান?

অনেকেই ভাবেন, বাচ্চার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিলেই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু বাস্তবে এতে হিতে বিপরীত হয়। বাচ্চা জেদ ধরে, কান্নাকাটি করে, এমনকি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। আমাদের দেশে অনেক পরিবারেই দাদু-দিদা বা আত্মীয়রা থাকেন। আপনি কড়া শাসন করলে হয়তো তাঁরাই বাচ্চার কান্না থামাতে ফোনটা হাতে তুলে দেবেন। তাই ‘নিষিদ্ধ’ করার চেয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা বেশি জরুরি।

  • একসাথে দেখুন: মাঝে মাঝে বাচ্চার পাশে বসে ওর পছন্দের ভিডিওটি দেখুন। এতে আপনি বুঝতে পারবেন ও কী দেখছে, আর ও-ও ভাববে আপনি ওর পছন্দে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
  • খোলামেলা কথা বলুন: ওকে বুঝিয়ে বলুন কেন কিছু জিনিস দেখা ঠিক নয়। যেমন, “এই ভিডিওটা দেখলে ভয় লাগতে পারে, তাই আমরা এটা দেখব না।”
  • স্ক্রিন-ফ্রি জোন তৈরি করুন: খাওয়ার টেবিলে বা ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে কোনো স্ক্রিন নয়—এই নিয়মটা বাড়ির সবার জন্য চালু করুন। আপনি নিজেও মানুন।

কীভাবে বুঝবেন সন্তান বিপদে পড়ছে?

সবসময় পাশে বসে থাকা সম্ভব হয় না। কিন্তু কিছু লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে:

১. মোবাইল বা ল্যাপটপ আপনি কাছে গেলেই যদি সে স্ক্রিন বন্ধ করে দেয় বা লুকিয়ে ফেলে।
২. যদি সে আগের চেয়ে বেশি চুপচাপ হয়ে যায় বা মেজাজ খিটখিটে দেখায়।
৩. ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে বা চমকে ওঠে।

এসব লক্ষণ দেখলে বকাঝকা না করে ঠান্ডা মাথায় বন্ধুর মতো কথা বলুন। ওকে বোঝান যে, আপনি ওর ভালোর জন্যই জানতে চাইছেন।

শেষ কথা

প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালন কোনো প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। আমরা কেউই নিখুঁত নই। প্রযুক্তির এই যুগে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা আমাদের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা। তাই নিজেকে দোষ দেবেন না। বাচ্চার হাতে গ্যাজেট দেওয়া মানেই আপনি খারাপ বাবা বা মা নন। শুধু একটু সচেতন থাকা প্রয়োজন।

আজ থেকেই শুরু করুন ছোট একটা পরিবর্তন। হয়তো আজ রাতে খাওয়ার সময় টিভি বা মোবাইল বন্ধ রেখে সবাই মিলে গল্প করলেন। কিংবা বাচ্চার সাথে বসে ওর পছন্দের কার্টুনটা নিয়ে আলোচনা করলেন। এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই আপনার সন্তানকে অনলাইনে এবং অফলাইনে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, প্রযুক্তির দেয়াল নয়, আপনার ও সন্তানের মধ্যকার বিশ্বাসের সম্পর্কটাই হলো আসল সুরক্ষা।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

লেখালেখি হোক

ছানাপোনার সাথে

সচরাচর জিজ্ঞসা

সচরাচর জিজ্ঞসা

লেখকের জন্য সচরাচর জিজ্ঞাসা

আপনি ছানাপোনায় লিখতে চান? আমাদের লেখকরা সাধারনত যে ধরনের প্রশ্ন করে থাকে, সেগুলোর কয়েকটি এখানে আছে।  

ছানাপোনায় সাধারনত শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও  বেড়ে ওঠা সংক্রান্ত যে কোন ধরনের লেখা প্রকাশিত হয়।