সারাদিনের খাটনি শেষে যখন বাসায় ফিরলেন, দেখলেন আপনার ছোট সন্তানটি কোণায় বসে একমনে মোবাইলে কিছু দেখছে। আপনি ডাক দিলেন, কিন্তু তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। বারবার ডাকার পর যখন সে মুখ তুলল, তার চোখেমুখে এক ধরণের বিরক্তি। এই দৃশ্যটি আমাদের অনেক বাংলাদেশি ঘরেই এখন খুব চেনা। সারাদিন অফিস, ঘরকন্না আর সংসারের চাপে আপনি যখন ক্লান্ত, তখন সন্তানকে শান্ত রাখতে হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া ছাড়া অনেক সময় আর কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু দিন শেষে মনের ভেতর একটা ভয় ঠিকই খচখচ করে—আমার বাচ্চাটা ইন্টারনেটের এই বিশাল জগতে আসলে কী দেখছে? ও কি নিরাপদ আছে?
ডিজিটাল জগত এখন আমাদের জীবনেরই অংশ। চাইলেই আমরা বাচ্চাদের পুরোপুরি ফোন বা ইন্টারনেট থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না। বরং আমাদের কাজ হলো তাদের হাত ধরে এই নতুন দুনিয়ায় পথ চলতে শেখানো। আপনি একা নন, আমরা সবাই এই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আজকের এই লেখাটি আপনাকে বাড়তি কোনো চাপ দেওয়ার জন্য নয়, বরং এই ডিজিটাল যুগে আপনার সন্তানকে সহজভাবে সুরক্ষিত রাখার কিছু বাস্তব কৌশল নিয়ে কথা বলতেই সাজানো হয়েছে।
১. শাসনের আগে সহজ আলাপ আর বন্ধুত্ব
বাচ্চারা যখন দেখে আমরা তাদের ফোন নিয়ে বেশি কড়াকড়ি করছি, তখন তারা অনেক কিছু আমাদের কাছ থেকে লুকাতে শুরু করে। তাই সবকিছুর আগে দরকার একটি সহজ সম্পর্কের। সে যখন ফোনে কোনো কার্টুন বা ভিডিও দেখছে, তখন ধমক না দিয়ে পাশে বসে জিজ্ঞাসা করুন, “আজকে তুমি কী দেখছ? এটা তো বেশ মজার মনে হচ্ছে!” সে যখন বুঝবে আপনি তার প্রিয় জিনিসের ওপর রাগ করছেন না, তখন সে নিজে থেকেই আপনাকে নানা কিছু দেখাবে।
“আম্মু, দেখ এই বিড়ালটা কেমন মজার নাচ দিচ্ছে!”—বাচ্চার এই ছোট ছোট উৎসাহে যখন আপনি সাড়া দেবেন, তখন তার মনে আপনার প্রতি আস্থা বাড়বে। ভবিষ্যতে ইন্টারনেটে যদি সে খারাপ কিছু দেখে ফেলে, তবে ভয়ে লুকিয়ে না রেখে সে আপনাকেই প্রথম এসে বলবে।
২. সময়ের একটি সুন্দর নিয়ম তৈরি করা
ছোট ফ্ল্যাট বাড়িতে বা ব্যস্ত শহরে বাচ্চাদের বাইরে গিয়ে খেলার সুযোগ খুব কম। তাই তারা ঘরে বসে মোবাইলে সময় কাটাতে চায়। তবে সারাক্ষণ ফোন না দিয়ে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দিন। যেমন, দুপুরে খাওয়ার পর এক ঘণ্টা অথবা বিকেলে পড়ার আগে কিছুক্ষণ। তবে নিয়মটা যেন শুধু বাচ্চার ওপর না হয়, পরিবারের সবার জন্য হওয়া ভালো।
- খাওয়ার টেবিলে কোনো ফোন নয়। এই সময়টুকু শুধু গল্প আর হাসাহাসির জন্য রাখুন।
- ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরণের পর্দা বা স্ক্রিন বন্ধ করে দিন। এতে বাচ্চার ঘুমের মান ভালো হবে।
৩. নিজের অভ্যাসটা একবার পরখ করে দেখা
বাচ্চারা যা শোনে তার চেয়ে যা দেখে তা বেশি শেখে। আমরা যদি নিজেরাই সারাক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে থাকি, তবে বাচ্চাকে “ফোন ধরো না” বলাটা খুব একটা কাজ করে না। অফিস থেকে ফেরার পর বা ছুটির দিনে ফোনটা দূরে রেখে বাচ্চার সাথে একটু গল্প করুন। হতে পারে সেটা স্কুলের কোনো মজার ঘটনা কিংবা পাড়ার কোনো খালার গল্প। আপনি যখন নিজের ফোনের ব্যবহার কমিয়ে দেবেন, বাচ্চা অবচেতনভাবেই আপনাকে অনুকরণ করতে শুরু করবে।
৪. ইন্টারনেটের জগত নিয়ে গল্প করা
ইন্টারনেট বা ভিডিও দেখার অ্যাপগুলো কীভাবে কাজ করে, তা বাচ্চার বয়স অনুযায়ী তাকে সহজ করে বুঝিয়ে বলুন। তাকে বলতে পারেন যে ইন্টারনেটে যেমন অনেক শেখার জিনিস আছে, তেমনি কিছু জিনিস আছে যা তার জন্য নয়। যেমন আমরা রাস্তায় চলার সময় অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে চকলেট নেই না, তেমনি ইন্টারনেটেও অপরিচিত কারো সাথে কথা বলা বা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া ঠিক নয়। এই বোধটা তাকে ভয়ের মাধ্যমে নয়, বরং সতর্কতার সাথে শেখান।
৫. বিকল্প কিছু আনন্দের ব্যবস্থা করা
বাচ্চা যখন বিরক্ত হয় বা একা বোধ করে, তখনই সে ফোনের দিকে হাত বাড়ায়। তাই তাকে অন্য কিছুতে ব্যস্ত রাখা খুব জরুরি। বাসার ছোট ছোট কাজে তাকে সাথে নিন। যেমন—গাছে পানি দেওয়া, একসাথে আটা মাখা কিংবা আলমারি গোছানো। ছুটির দিনে দাদা-দাদি বা নানা-নানির সাথে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দিন কিংবা তাদের কোনো পুরোনো গল্পের ঝুলি খুলতে বলুন। পারিবারিক এই বন্ধনগুলো বাচ্চাকে স্ক্রিনের নেশা থেকে দূরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
আমাদের ছোটবেলায় লডু বা ক্যারাম খেলার যে আনন্দ ছিল, সেই স্বাদটুকু আমাদের সন্তানদেরও দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। ড্রয়িং রুমে একসাথে বসে লুডু খেলা কিংবা কাগজের নৌকা বানানো—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো বাচ্চার জন্য ইন্টারনেটের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।






