শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে যা করবেন

নিয়মিত আপনার মেইলে লেখা পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

নিবন্ধটিতে যা যা থাকছে

রাত তখন আটটা কি সাড়ে আটটা। সারাটা দিন দৌড়ঝাঁপের ওপর দিয়ে গেছে। হয়তো আপনি অফিস থেকে ফিরেছেন, নয়তো ঘরের হাজারটা কাজ সামলেছেন। এর মধ্যে বাচ্চার কোচিং থেকে আসা, হাত-মুখ ধোয়ানো, আর টেবিলে পড়তে বসানো—সব মিলিয়ে আপনি ক্লান্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে দেখলেন, আপনার সন্তান খাতা-কলম ছুড়ে দিয়ে বলছে, “আমি আর পড়ব না!” অথবা চুপচাপ মোবাইলে গেম খেলছে, আপনার কথার কোনো উত্তরই দিচ্ছে না। আপনার হয়তো তখন খুব রাগ লাগছে, মনে হচ্ছে একটু বকা দিলে বা চিল্লাচিল্লি করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মনের ভেতর কোথাও একটা খচখচানি কাজ করছে যে, বাচ্চাটা কি আসলে ভালো আছে?

এই যে প্রতিদিনের ছোট ছোট জেদ, মন খারাপ বা কথা না শোনা—এগুলো কিন্তু শুধু দুষ্টুমি নয়। অনেক সময় এগুলো বাচ্চার মনের ভেতরের অস্থিরতার প্রকাশ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা বাচ্চার শরীর খারাপ হলে সাথে সাথে ডাক্তার দেখাই, কিন্তু মনের স্বাস্থ্যের কথা উঠলে ভাবি “এসব তো বড়দের ব্যাপার”। আসলে ছোটদেরও মন খারাপ হয়, তাদেরও ভয় বা চাপ লাগে। এই লেখাটি আপনার জন্য, যেখানে আমরা একদম সহজভাবে আলোচনা করব কীভাবে প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও আপনার বাচ্চার মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে পারেন। আমাদের লক্ষ্য কোনো উপদেশ দেওয়া নয়, বরং আপনার প্রতিদিনের লড়াইটাকে একটু সহজ করে তোলা।

বাচ্চার কথা মন দিয়ে শোনা

আমরা অনেক সময় মনে করি, বাচ্চা কথা বলছে মানেই আমরা শুনছি। কিন্তু বাচ্চা যখন স্কুলে কোনো ঝগড়া বা তার ভয়ের কথা বলে, আমরা সাথে সাথে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, “ও কিছু না, বড় হও সব ঠিক হয়ে যাবে।” এতে বাচ্চা মনে করে তার অনুভূতির কোনো দাম নেই। বাচ্চার মনের স্বাস্থ্য ভালো রাখার প্রথম ধাপ হলো তাকে ‘জাজ’ না করে কথা শুনতে দেওয়া।

“মা, আজ স্কুলে কেউ আমার সাথে খেলেনি।” এই কথাটি শোনার পর আমরা যদি বলি, “তুমি নিশ্চয়ই কিছু করেছ তাই খেলেনি,” তবে বাচ্চা পরের বার আর কিছু বলবে না। এর বদলে যদি বলি, “ও আচ্ছা? তোমার বুঝি খুব খারাপ লেগেছে একা থাকতে? আসো আমরা একটু গল্প করি,” তবে সে ভরসা পাবে।

বাচ্চা যখন বুঝবে যে তার মন খারাপের কথা বললে আপনি রাগ করবেন না, তখন তার ভেতরের অস্থিরতা অনেক কমে যাবে। তাকে প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট সময় দিন যেখানে কোনো পড়ালেখা বা কাজের কথা হবে না। শুধু সে যা বলতে চায়, তাই শুনুন।

পড়াশোনার চাপ ও প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি

আমাদের বাংলাদেশে বাচ্চাদের ওপর পড়াশোনার যে চাপ, সেটা অনেক সময় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। সকালবেলা স্কুল, দুপুরে কোচিং, বিকেলে আবার বাসায় টিচার—এই রুটিনে বাচ্চার নিজের জন্য কোনো সময় থাকে না। অন্য বাচ্চার সাথে তুলনা করা আমাদের সমাজের একটা বড় সমস্যা। “অমুকের ছেলে গোল্ডেন এ পেয়েছে, তুমি কেন পেলে না?”—এই ধরণের কথা বাচ্চার আত্মবিশ্বাস একদম কমিয়ে দেয়।

মনে রাখবেন, আপনার সন্তান কোনো যন্ত্র নয়। তার মেধা অন্য কারো সাথে তুলনা করবেন না। তাকে বোঝান যে সে চেষ্টা করছে, এটাই আপনার কাছে বড় বিষয়। পরীক্ষার রেজাল্ট যাই হোক, আপনার ভালোবাসা যে কমবে না, এই নিশ্চয়তা বাচ্চার মানসিক প্রশান্তির জন্য খুব জরুরি। যখন সে জানবে যে ব্যর্থ হলেও তার বাবা-মা তার পাশে আছে, তখন সে আরও সাহস নিয়ে কাজ করতে পারবে।

মোবাইল ও ইন্টারনেটের দুনিয়া

এখনকার দিনে ডিজিটাল জীবন থেকে বাচ্চাকে পুরোপুরি দূরে রাখা কঠিন। আমরা যখন কাজে ব্যস্ত থাকি, তখন হয়তো বাচ্চা মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম বাচ্চার মেজাজ খিটখিটে করে দেয়। তারা অনেক সময় ইউটিউব বা গেমে এমন সব জিনিস দেখে যা তাদের মনে ভয় বা অস্থিরতা তৈরি করে।

  • স্ক্রিন টাইমের একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দিন। যেমন, দিনে ১ ঘণ্টার বেশি মোবাইল নয়।
  • বাচ্চা ইন্টারনেটে কী দেখছে তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন। তাকে ধমক না দিয়ে বন্ধুর মতো জিজ্ঞাসা করুন সে কী দেখছে।
  • মোবাইলের বদলে গল্পের বই বা হাতে আঁকাআঁকির প্রতি উৎসাহ দিন। এতে তাদের কল্পনাশক্তি বাড়ে এবং মন শান্ত থাকে।

পরিবারের বড়দের সাথে সমন্বয়

আমাদের দেশে অনেক সময় যৌথ পরিবারে বা দাদা-দাদি, নানা-নানির সাথে থাকা হয়। অনেক সময় দেখা যায় আপনি বাচ্চাকে কোনো কাজে মানা করছেন, কিন্তু পরিবারের অন্য কোনো বড় সদস্য আদর করে তাকে সেটা করতে দিচ্ছেন। এই যে নিয়ম ভাঙার দ্বিমুখী আচরণ, এটা বাচ্চাকে বিভ্রান্ত করে। এতে তাদের আচরণে জেদ বাড়ে।

এই সমস্যা সমাধানে বড়দের সাথে আলাদা করে কথা বলুন। তাদের বোঝান যে বাচ্চার মঙ্গলের জন্যই আপনারা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে চান। সবাইকে সম্মান রেখেই বাচ্চার জন্য একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। বাড়িতে যখন বড়রা একে অপরের সাথে চিৎকার করে কথা বলেন বা ঝগড়া করেন, তার সরাসরি প্রভাব বাচ্চার মনে পড়ে। বাচ্চার সামনে শান্ত থাকার চেষ্টা করা তার মানসিক নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।

বাচ্চার ছোট ছোট অর্জন উদযাপন করা

আমরা অনেক সময় বড় কোনো সাফল্য ছাড়া বাচ্চাকে প্রশংসা করি না। কিন্তু বাচ্চার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ছোট ছোট প্রশংসা জাদুর মতো কাজ করে। সে হয়তো আজ নিজের জুতা নিজে পরেছে, বা মন দিয়ে আধা ঘণ্টা অংক করেছে—এটুকুর জন্যই তাকে বাহবা দিন। এই ছোট ছোট স্বীকৃতি তাকে খুশি রাখে এবং ভালো কাজ করার আগ্রহ বাড়ায়।

শেষ কথা

সন্তান লালন-পালন করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। আপনি যে প্রতিদিন চেষ্টা করছেন আপনার বাচ্চার জন্য সেরাটা করার, সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আপনার সবসময় পারফেক্ট হতে হবে না। মাঝেমধ্যে মেজাজ বিগড়ে যাওয়া বা ভুল করা খুব স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুল হলে সেটা বাচ্চার কাছে স্বীকার করা এবং তাকে ভালোবাসা দেওয়া।

বাচ্চার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা মানে তাকে শুধু হাসিখুশি রাখা নয়, বরং তাকে নিজের আবেগগুলো বুঝতে শেখানো। সে যদি রাগ করে বা কান্নাকাটি করে, তাকে বুঝতে দিন যে এটা স্বাভাবিক। আপনি পাশে আছেন, এটাই তার জন্য যথেষ্ট। আপনার ধৈর্য এবং একটুখানি বাড়তি আদরই পারে একটি সুস্থ ও সুন্দর শৈশব উপহার দিতে।

আপনি কি আজ আপনার সন্তানের সাথে একটু বাড়তি সময় কাটাতে পারেন? হয়তো কোনো কাজ ছাড়াই শুধু তার পাশে বসে থাকা বা তাকে একটু জড়িয়ে ধরা দিয়েই শুরু করতে পারেন।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

লেখালেখি হোক

ছানাপোনার সাথে

সচরাচর জিজ্ঞসা

সচরাচর জিজ্ঞসা

লেখকের জন্য সচরাচর জিজ্ঞাসা

আপনি ছানাপোনায় লিখতে চান? আমাদের লেখকরা সাধারনত যে ধরনের প্রশ্ন করে থাকে, সেগুলোর কয়েকটি এখানে আছে।  

ছানাপোনায় সাধারনত শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও  বেড়ে ওঠা সংক্রান্ত যে কোন ধরনের লেখা প্রকাশিত হয়।