শিশুর মানসিক বিকাশে ছবি আঁকার ভূমিকা

নিয়মিত আপনার মেইলে লেখা পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

নিবন্ধটিতে যা যা থাকছে

শিশুরা যখন রংপেন্সিল, কাগজ বা ক্যানভাস নিয়ে বসে, তখন তারা কেবল সময় কাটানোর জন্য দাগ কাটে না। এটি তাদের মনের ভাব প্রকাশ করার এবং সৃজনশীলতা বাড়ানোর একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে একটি শিশুর কল্পনাশক্তি ডানা মেলতে শুরু করে, যা তার সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতিতে সরাসরি ও গভীর প্রভাব ফেলে।

শিশুর মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে ছবি আঁকা বা রং করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এটি শিশুদের মনোযোগ বাড়াতে, চোখের ও হাতের সমন্বয় ঘটাতে এবং নিজের আবেগকে বুঝতে সাহায্য করে। প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি এই ধরনের সৃজনশীল কাজ শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য এবং তাকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখার জন্য সমানভাবে জরুরি।

মনের ভাব প্রকাশে রঙের ব্যবহার

অনেক সময় ছোট শিশুরা মুখে বলে নিজেদের সব অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। তাদের মনে জমে থাকা রাগ, অভিমান, ভয় কিংবা আনন্দগুলো তখন রঙের মাধ্যমে কাগজে ফুটে ওঠে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর আঁকা ছবি তার অবচেতন মনের আয়না। হয়তো সে একটি কালো মেঘ আঁকছে মানে তার মন খারাপ, আবার উজ্জ্বল হলুদ সূর্য আঁকছে মানে সে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে অনেক সময় শিশুরা বড়দের ভিড়ে নিজেদের কথা বলার সুযোগ পায় না, সেখানে আঁকাআঁকি হতে পারে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। সে যখন খাতায় নিজের মতো করে একটি ঘর, নদী বা তার প্রিয় খেলনাটি আঁকে, তখন সে আসলে তার নিজের জগতটাকে তৈরি করে। এই স্বাধীনতা তাকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেয় এবং চাপমুক্ত রাখে।

শিশুর মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতা

শিশুর মানসিক বিকাশ মানে শুধু বইয়ের পড়া মুখস্থ করা নয়, বরং নতুন কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জন করা। ছবি আঁকার সময় শিশুকে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেমন, গাছের পাতা সবুজ হবে নাকি হলুদ, আকাশটা নীল হবে নাকি কমলা। এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো তার চিন্তাশক্তিকে শানিত করে।

যখন একটি শিশু সাদা কাগজের ওপর শূন্য থেকে কিছু সৃষ্টি করে, তখন তার মস্তিষ্কের ডান দিক বা সৃজনশীল অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি তাকে ভবিষ্যতে যেকোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে সাহায্য করে। আমাদের ব্যস্ত শহরের ছোট ফ্ল্যাটে বা পড়াশোনার চাপে শিশুরা অনেক সময় একঘেয়েমিতে ভোগে। এই একঘেয়েমি কাটাতে এবং মস্তিষ্ককে সচল রাখতে আঁকাআঁকি একটি চমৎকার ব্যায়াম।

পড়াশোনার চাপ ও একটি ছোট্ট দৃশ্যপট

রাইয়ানের কথাই ধরা যাক। বয়স মাত্র সাত। স্কুল আর কোচিং শেষে যখন সে বাসায় ফেরে, তখন ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরে। কিন্তু তার মা তাকে সঙ্গে সঙ্গে পড়তে বসার জন্য চাপ দেন না। তিনি রাইয়ানের হাতে এক বাক্স রং আর খাতা তুলে দেন। রাইয়ান যখন তার কল্পনার রোবট বা গ্রামের দৃশ্য আঁকতে শুরু করে, তখন তার সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়। আঁকা শেষ হলে সে উৎসাহ নিয়ে মাকে দেখায়। এই যে মানসিক প্রশান্তি আর অর্জনের আনন্দ, এটি তাকে পরদিন স্কুলে যাওয়ার এবং নতুন করে পড়াশোনা করার শক্তি যোগায়।

“শিশুকে জোর করে শিল্পী বানানোর প্রয়োজন নেই, তাকে শুধু তার মতো করে আঁকতে দিন। এই প্রক্রিয়াই তার মনকে বড় করবে।”

মনোযোগ ও ধৈর্য বৃদ্ধি

আজকাল অনেক অভিভাবকেরই অভিযোগ থাকে যে তাদের সন্তান এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির হয়ে বসতে চায় না। চঞ্চলতা শিশুদের স্বভাবজাত হলেও, কোনো একটি কাজে মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। ছবি আঁকা এমন একটি কাজ যা শিশুকে দীর্ঘ সময় এক জায়গায় ধৈর্য ধরে বসতে শেখায়।

একটি ছবির বর্ডার লাইন ঠিক রাখা, রঙের শেড মেলানো বা নিখুঁতভাবে বৃত্ত আঁকার চেষ্টা—এসব কিছুই শিশুর একাগ্রতা বাড়ায়। এই মনোযোগ পরবর্তীতে তার স্কুলের পড়াশোনা এবং ক্লাসে শিক্ষকের কথা শোনার ক্ষেত্রেও কাজে লাগে।

হাতের লেখা ও পেশির দক্ষতা

মানসিক বিকাশের সাথে শারীরিক দক্ষতার একটি যোগসূত্র রয়েছে। শিশু যখন রংপেন্সিল বা তুলি শক্ত করে ধরে, তখন তার হাতের আঙুল ও কব্জির ছোট পেশিগুলো শক্তিশালী হয়। একে বলা হয় ‘ফাইন মোটর স্কিল’। যাদের এই দক্ষতা ভালো, পরবর্তী সময়ে তাদের হাতের লেখা সুন্দর ও দ্রুত হয়। তাই শিশুকে সুন্দর হাতের লেখা শেখানোর আগে তাকে ইচ্ছেমতো আঁকিবুঁকি কাটতে দেওয়া উচিত।

অভিভাবক হিসেবে আপনার করণীয়

শিশুর আঁকাআঁকির প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি তার মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। অনেক সময় আমরা না বুঝেই এমন কিছু মন্তব্য করি যা শিশুর আগ্রহ কমিয়ে দেয়। যেমন, “হাতি কেন লাল রঙের হবে?” বা “তোমার আঁকা কিছুই হয়নি।” এসব কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।

বরং তাকে উৎসাহিত করতে আপনি বলতে পারেন:

  • “বাহ! তুমি তো খুব সুন্দর করে রং করেছ।”
  • “আমাকে বলো তো, এই ছবিতে তুমি কী কী এঁকেছ?”
  • “তোমার আঁকা এই গাছটা দেখতে খুব অন্যরকম ও সুন্দর লাগছে।”

মনে রাখবেন, ছবি কতটা নিখুঁত হলো সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, আঁকার সময় শিশুটি কতটা আনন্দ পেল এবং তার মস্তিষ্ক কতটা সক্রিয় থাকল। তার আঁকা ছবিগুলো ঘরের দেয়ালে বা ফ্রিজে লাগিয়ে রাখুন। এতে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে এবং তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

শেষ কথা

প্রতিটি শিশুই জন্মগতভাবে শিল্পী। তাদের জগতটা আমাদের মতো যুক্তিনির্ভর নয়, বরং কল্পনায় ভরা। সেই কল্পনার জগতকে রঙের ছোঁয়ায় বিকশিত হতে দিন। পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুকে আঁকাআঁকির সুযোগ করে দেওয়া মানে তার মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া।

অভিভাবক হিসেবে আপনার কাজ হলো তাকে কেবল উপকরণ দিয়ে সাহায্য করা এবং তার প্রচেষ্টার প্রশংসা করা। দেখবেন, এই ছোট্ট রংপেন্সিল আর কাগজই আপনার সন্তানের মানসিক বিকাশের পথে এক বড় বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

লেখালেখি হোক

ছানাপোনার সাথে

সচরাচর জিজ্ঞসা

সচরাচর জিজ্ঞসা

লেখকের জন্য সচরাচর জিজ্ঞাসা

আপনি ছানাপোনায় লিখতে চান? আমাদের লেখকরা সাধারনত যে ধরনের প্রশ্ন করে থাকে, সেগুলোর কয়েকটি এখানে আছে।  

ছানাপোনায় সাধারনত শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও  বেড়ে ওঠা সংক্রান্ত যে কোন ধরনের লেখা প্রকাশিত হয়।