শিশুর জন্য মিডিয়া লিটারেসি কেন জরুরি

নিয়মিত আপনার মেইলে লেখা পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

নিবন্ধটিতে যা যা থাকছে

বর্তমান যুগে শিশুরা জন্মের পর থেকেই কোনো না কোনো পর্দার বা স্ক্রিনের সংস্পর্শে বড় হচ্ছে। মিডিয়া লিটারেসি হলো এমন একটি দক্ষতা যা শিশুদের টেলিভিশন, ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা বিষয়বস্তু সঠিকভাবে বুঝতে এবং বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। এটি কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নয়, বরং স্ক্রিনে যা দেখা যাচ্ছে তার পেছনের উদ্দেশ্য এবং সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতা।

শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য এই দক্ষতাটি এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন তারা কার্টুন, গেমস বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অসংখ্য তথ্য গ্রহণ করছে, যার সবকিছু তাদের বয়সের উপযোগী বা সত্য নয়। মিডিয়া লিটারেসি বা মিডিয়া সচেতনতা থাকলে একটি শিশু বুঝতে পারে কোনটি বিনোদন, কোনটি বিজ্ঞাপন এবং কোনটি বাস্তব জীবনের অংশ। এই বোধশক্তি তাদের নিরাপদ রাখতে এবং মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মিডিয়া লিটারেসি আসলে কী?

সহজ কথায় বলতে গেলে, মিডিয়া লিটারেসি হলো মিডিয়ার ভাষা বোঝার ক্ষমতা। আমরা যেমন শিশুকে রাস্তা পার হওয়ার সময় ডানে-বাঁয়ে তাকাতে শেখাই, ঠিক তেমনি ইন্টারনেটের জগতেও কোনটি নিরাপদ আর কোনটি নয়, তা শেখানোই হলো মিডিয়া লিটারেসি।

এর মাধ্যমে শিশু প্রশ্ন করতে শেখে। যেমন, সে যখন টিভিতে কোনো খবর বা ইউটিউবে কোনো ভিডিও দেখে, তখন সে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে, “এটা কে তৈরি করেছে?”, “কেন তৈরি করেছে?” অথবা “এই তথ্যটি কি সঠিক?”। এই প্রশ্ন করার অভ্যাসটি তাকে অন্ধভাবে কোনো কিছু বিশ্বাস করা থেকে বিরত রাখে।

কেন এটি এখনকার শিশুদের জন্য অপরিহার্য?

আমাদের দেশে এখন প্রায় প্রতিটি ঘরেই স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। শিশুরা খুব সহজেই ইউটিউব বা গেমসের জগতে প্রবেশ করছে। কিন্তু এই অবাধ বিচরণের কিছু ঝুঁকিও আছে।

  • বাস্তবতা বনাম কাল্পনিক জগত: শিশুরা অনেক সময় স্ক্রিনে দেখা চাকচিক্যময় জীবনকে বাস্তব মনে করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের ‘পারফেক্ট’ ছবি দেখে নিজের জীবন নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে।
  • গুজব বা ভুল তথ্য: ইন্টারনেটে অনেক সময় ভুল তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। শিশু যদি যাচাই করতে না জানে, তবে সে সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারে।
  • নিরাপত্তা ঝুঁকি: অনেক সময় শিশুরা না বুঝেই ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে ফেলে। মিডিয়া লিটারেসি তাদের শেখায় যে অনলাইনে সবকিছু শেয়ার করা নিরাপদ নয়।

বিজ্ঞাপনের ফাঁদ এবং বাস্তবতা: একটি উদাহরণ

শিশুরা অনেক সময় ইউটিউব ভিডিও দেখে কোনো নির্দিষ্ট খেলনা বা খাবারের জন্য বায়না ধরে। তারা মনে করে, ভিডিওর শিশুটি ওই খেলনাটি পেয়ে সত্যিই খুব খুশি। কিন্তু এর পেছনে যে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বা বিজ্ঞাপন কাজ করছে, তা তারা বুঝতে পারে না।

“মা, দেখো এই ইউটিউবার ভাইয়াটা বলছে এই চিপসটা খেলে শক্তি বাড়ে! আমাকেও এটা কিনে দাও।”

সাত বছরের আয়ান একদিন স্কুল থেকে ফিরে ইউটিউব দেখতে দেখতে মাকে এ কথা বলছিল। আয়ানের মা তখন তাকে বকা না দিয়ে পাশে বসালেন। তিনি শান্তভাবে বুঝিয়ে বললেন, “বাবা, ওই ভাইয়াকে চিপস কোম্পানি টাকা দিয়েছে ওটা বলার জন্য। এটা আসলে একটা বিজ্ঞাপন, সত্যি সত্যি শক্তি বাড়ার কোনো জাদুকরী খাবার নয় এটি।”

এই ছোট আলোচনাটিই হলো মিডিয়া লিটারেসির শুরু। শিশু যখন বুঝতে পারে যে স্ক্রিনের সব হাসি-কান্না বা কথা সত্য নয়, তখন সে মানসিকভাবে অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে।

বাবা-মা হিসেবে আপনি কীভাবে শেখাবেন?

শিশুকে মিডিয়া লিটারেসি শেখানোর জন্য আপনাকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। দৈনন্দিন আলোচনার মাধ্যমেই আপনি এটি শুরু করতে পারেন।

১. একসঙ্গে দেখুন এবং আলোচনা করুন

শিশুর হাতে ফোন দিয়ে আপনি আপনার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন না। মাঝে মাঝে তার পাশে বসে দেখুন সে কী দেখছে। কার্টুন বা ভিডিওর বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন করুন। যেমন, “তুমি কি মনে করো বিড়াল আসলেই এভাবে কথা বলতে পারে?” বা “এই লোকটা যে রেগে গেল, এটা কি ঠিক হলো?”

২. বিজ্ঞাপনের কৌশল বোঝান

টিভিতে বা মোবাইলে যখন কোনো বিজ্ঞাপন আসবে, তখন শিশুকে জিজ্ঞেস করুন, “তারা কেন এই পণ্যটি এত সুন্দর করে দেখাচ্ছে?” তাকে বোঝান যে বিজ্ঞাপনের মূল লক্ষ্য হলো জিনিসটি বিক্রি করা, তাই তারা অনেক সময় বাড়িয়ে বলে।

৩. তথ্যের উৎস যাচাই করতে শেখান

স্কুলের প্রজেক্ট বা সাধারণ কৌতূহল থেকে শিশু যখন কোনো তথ্য ইন্টারনেটে খুঁজবে, তখন তাকে একাধিক ওয়েবসাইট বা উৎস দেখতে বলুন। তাকে শেখান যে উইকিপিডিয়া বা গুগল সার্চে আসা প্রথম তথ্যটিই সবসময় সঠিক নাও হতে পারে।

৪. ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে ধারণা দিন

একটু বড় শিশুদের বোঝান যে ইন্টারনেটে একবার কোনো ছবি বা মন্তব্য পোস্ট করলে তা চিরস্থায়ী হয়ে যেতে পারে। রাগের মাথায় বা আবেগের বশবর্তী হয়ে কিছু লেখা বা শেয়ার করা উচিত নয়।

শেষ কথা

শিশুর হাতে স্মার্টফোন বা রিমোট তুলে দেওয়া বর্তমান সময়ে একরকম অনিবার্য হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির এই প্রবাহকে আমরা আটকে রাখতে পারব না, কিন্তু আমরা শিশুকে এর ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা দিতে পারি। মিডিয়া লিটারেসি শিশুকে একজন সচেতন ও বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

তাই আজ থেকেই ছোট ছোট উদাহরণের মাধ্যমে আপনার সন্তানের সাথে কথা বলা শুরু করুন। তাকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করুন। আপনার একটু সচেতনতাই আপনার সন্তানকে ভার্চুয়াল জগতের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করতে পারে। ধৈর্য ধরুন, কারণ এই শেখার প্রক্রিয়াটি একদিনের নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী।

লেখাটি শেয়ার করুন: 

লেখালেখি হোক

ছানাপোনার সাথে

সচরাচর জিজ্ঞসা

সচরাচর জিজ্ঞসা

লেখকের জন্য সচরাচর জিজ্ঞাসা

আপনি ছানাপোনায় লিখতে চান? আমাদের লেখকরা সাধারনত যে ধরনের প্রশ্ন করে থাকে, সেগুলোর কয়েকটি এখানে আছে।  

ছানাপোনায় সাধারনত শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও  বেড়ে ওঠা সংক্রান্ত যে কোন ধরনের লেখা প্রকাশিত হয়।